বুক রিভিউ

দ্যা প্যান্থার ও ভ্রান্তি নিরসন, পর্ব-২

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

এই পর্বে সাইফুদ্দিন কুতুয সম্পর্কে দ্য প্যান্থার গ্রন্থের লেখক যেসব তথ্য দিয়েছেন তা নিয়ে বিশ্লেষণ করা হবে। বিস্তারিত আলোচনার পূর্বে এক নজরে সাইফুদ্দিন কুতুযের জীবনি দেখে নেয়া যাক।

সাইফুদ্দিন কুতুয

সাইফুদ্দিন কুতুযের প্রকৃত নাম মাহমুদ বিন মামদুদ। তিনি ছিলেন খাওয়ারেজমের সুলতান জালালুদ্দিন খাওয়ারেজম শাহের ভাগ্নে। জালালুদ্দিন খাওয়ারেজম শাহ তাতারীদের বিরুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়ে পরাজয় বরণ করেন। এসময় তার পরিবারের বড়দের তাতারীরা হত্যা করে। ছোটদের অনেকের সাথে মাহমুদ বিন মামদুদ বন্দী হন। তার সাহসিকতা ও বীরত্ব দেখে তাতারীরা তার নামকরণ করে কুতুয । এই শব্দের অর্থ নিকৃষ্ট কুকুর।

তাতারীরা কুতুযকে দামেশকের দাস বাজারে বিক্রি করে দেয়। এক ব্যক্তি তাকে ক্রয় করে মিশরে নিয়ে আসেন। বালক কুতুয বেড়ে ওঠেন মিশরের মামলুকদের সাথে। আরবীতে মামলুক বলা হয় গোলাম বা দাসকে। আইয়ুবী শাসনামলে আমীর ও সুলতানরা যুদ্ধের জন্য মামলুকদের উপর ভরসা রাখতেন। তাদের দেয়া হতো উচ্চতর প্রশিক্ষণ।

মামলুকদের আরবী শেখানো হতো। ফিকহের প্রাথমিক শিক্ষা দেয়া হত। প্রাপ্তবয়সে পৌছলে তাদের রণশাস্ত্র, অশ্বারোহণ, তীর নিক্ষেপ ও তরবারী চালনা শিক্ষা দেয়া হত। তাদের পরিচর্যার প্রতি খেয়াল রাখা হত। এমনকি সুলতান নাজমুদ্দিন আইয়ুবের মত প্রভাবশালী আইয়ুবী সুলতানও মামলুকদের পাশে এসে তাদের খোজখবর নিতেন। তাদের সাথে গল্প করতেন, খাবার খেতেন।

এভাবেই মামলুকরা বেড়ে উঠতো। কুতুযও এদের সাথেই বেড়ে উঠেন। কয়েকজন মনিবের হাত ঘুরে কুতুয , ইযযুদ্দিন আইবেকের মালিকানায় আসেন। কুতুযের গুনে মুগ্ধ হয়ে ইযযুদ্দিন আইবেক তাকে নিজের সেনাপতি বানান। শাজারাতুদ দূর কর্তৃক ইযযুদ্দিন আইবেক নিহত হওয়ার পর ইযযুদ্দিন আইবেকের বালক পুত্র নুরুদ্দিন আলির বায়াত নেয়া হয়।

এসময় সেনাপতি কুতুযকে তার অভিভাবক মনোনিত করা হয়। এটা ৬৫৫ হিজরীর ঘটনা। কিছুদিন পর ৬৫৬ হিজরীতে তাতারীদের হাতে বাগদাদের পতন ঘটে। হালাকুর বাহিনী একের পর এক দখল করে নেয় ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার বিস্তৃর্ণ এলাকা। ৬৫৭ হিজরীর যিলকদ মাসে হালাকুর বাহিনী এগিয়ে যাচ্ছিল আলেপ্পোর দিকে। আর সেসময় বালক নুরুদ্দিনকে হটিয়ে ক্ষমতায় আরোহন করেন সাইফুদ্দিন কুতুয। কুতুযের এ সিদ্ধান্ত ছিল সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত।

কারন বালক নুরুদ্দিন শাসনকার্য পরিচালনার যোগ্য ছিলেন না। এদিকে সিরিয়া দখলের পর হালাকুর বাহিনী মিসর আক্রমন করবে তা নিশ্চিত ছিল। সুতরাং এ সময়ে মিসরে প্রয়োজন ছিল একজন শক্তিশালী শাসক যিনি তাতারী ঝড়কে রুখে দিবেন।

সাইফুদ্দিন কুতুয দ্রুত সবকিছু গুছিয়ে নিচ্ছিলেন, এসময় হালাকু পত্র পাঠিয়ে হয় যুদ্ধ নইলে শর্তহীন আত্মসমর্পন এর আহবান জানায়। রুকনুদ্দিন বাইবার্সের পরামর্শে হালাকুর দুতদেরকে হত্যা করা হয়। যুদ্ধের দামামা বেজে উঠে। ২৫ রমজান ৬৫৮ হিজরীতে আইন জালুত প্রান্তরে তাতারী বাহিনীর মুখোমুখি হয় মুসলিম বাহিনী।

এ যুদ্ধে সাইফুদ্দিন কুতুয ও রুকনুদ্দিন বাইবার্সের বীরত্বের ফলে তাতারীরা পরাজিত হয়। থমকে যায় তাদের বিজয়রথ। এই যুদ্ধ জয়ের দুমাস পর মিশরে ফেরার পথে নিহত হন সাইফুদ্দিন কুতুয। (বিস্তারিত জানতে দেখুন ড. আলি মুহাম্মদ আস সাল্লাবি রচিত ‘আস সুলতান সাইফুদ্দিন কুতুয ওয়া মারিকাতু আইনি জালুত’ এবং ড. কাসেম আবদুহু কাসেম রচিত ‘আস সুলতানুল মুজাফফর সাইফুদ্দিন কুতুয বাতালু মারিকাতি আইনি জালুত’)

দ্য প্যান্থার ও সাইফুদ্দিন কুতুয

দ্য প্যান্থার বইয়ের লেখক শুরু থেকেই কুতুযের উপর একের পর এক অভিযোগ করেছেন। তাকে কলুষিত করার চেষ্টা করেছেন। কুতুযের উপর তার আপত্তিগুলো নিম্মরুপ–

১। কুতুয নিজের ক্ষমতা মজবুত করতে শাজারাতুদ দুরকে অন্যায়ভাবে হত্যা করিয়েছেন।
২। হালাকুর বিরুদ্ধে এগিয়ে যাওয়ার সাহস কুতুযের ছিল না।
৩। কুতুয আইন জালুত থেকে পালাতে চাচ্ছিলেন।
এবার এই তিনটি বিষয়ে আলোচনা করা যাক।

শাজারাতুদ দুরকে কেনো হত্যা করা হলো?

শাজারাতুদ দুর ছিলেন আইয়ুবী সুলতান নাজমুদ্দিন আইয়ুবের স্ত্রী। তিনি ছিলেন তুর্কি দাসী। ৬৪৭ হিজরীতে নাজমুদ্দিন আইয়ুব ইন্তেকাল করলে তার ছেলে তুরান শাহ ক্ষমতায় আসেন। তুরান শাহর সাথে সৎ মা শাজারাতুদ দুরের বিরোধ শুরু হয়।

শাজারাতুদ দূরের পরামর্শে রুকনুদ্দিন বাইবার্স, ফারেসুদ্দিন আকতাইসহ অন্যান্য মামলুকরা তুরান শাহকে হত্যা করেন। এটি ৬৪৮ হিজরীর ঘটনা (১) তুরান শাহের মৃত্যুর পর শাজারাতুদ দূর নিজেকে মিসরের রানী ঘোষণা করেন। তিনি ছিলেন নানা গুনে গুনান্বিত একজন মহিলা। শাজারাতুদ দুরের ক্ষমতায় আরোহনের ফলে সর্বত্র নিন্দার ঝড় উঠে।

বাগদাদের খলিফা মুস্তাসিম বিল্লাহ এক পত্রে মিসরবাসীকে উদ্দেশ্য করে লিখেন, আপনাদের মধ্যে পুরুষের অভাব থাকলে আমাকে জানান, এখান থেকে পুরুষ পাঠিয়ে দিব।(২) পরিস্থিতি বেগতিক দেখে শাজারাতুদ দুর ক্ষমতা থেকে সরে যেতে বাধ্য হন। তবে তিনি একটি কৌশল করেন। তিনি ইযযুদ্দিন আইবেককে বিয়ে করেন।

ইযযুদ্দিন আইবেক পরবর্তি সুলতান মনোনিত হন। মূলত ক্ষমতার কলকাঠি ছিল শাজারাতুদ দুরের হাতেই। ক্ষমতায় এসে ইযযুদ্দিন আইবেক নিজেকে স্ত্রীর প্রভাব থেকে মুক্ত করার চেষ্টা চালান। শাজারাতুদ দুরের প্রভাব খর্ব হতে থাকে। বিষয়টি শাজারাতুদ দূর মানতে পারছিলেন না। তাই তিনি ৬৫৫ হিজরীতে ইযযুদ্দিন আইবেককে হত্যা করেন। (৩)

হত্যার পর সাইফুদ্দিন কুতুয কয়েকজন সালারসহ প্রাসাদে যান। ইযযুদ্দিনের খুনিদের একজনকে সেখানে হত্যা করা হয়। শাজারাতুদ দুরকে বন্দী করা হয়। কয়েকদিন পর নুরুদ্দিন ক্ষমতায় আরোহন করলে শাজারাতুদ দুরকে নুরুদ্দিনের মা তথা ইযযুদ্দিনের আগের স্ত্রীর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। নুরুদ্দিনের মা দাসীদের নির্দেশ দেন খড়মের আঘাতে শাজারাতুদ দুরকে মেরে ফেলতে। খড়ম দিয়ে পিটিয়ে শাজারাতুদ দুরকে হত্যা করা হয়। (শাজারাতুদ দুরের জীবনি জানতে দেখুন ড. নুরুদ্দিন খলিল লিখিত শাজারাতুদ দুর)।

এ বিষয়ে প্যান্থার লেখকের বক্তব্য হলো, শিশু সুলতানকে যথেচ্ছা ব্যবহার করতে গেলে মা শাজারাতুদ দূর বাগড়া দিতে পারেন, এই ভয়ে শাজারাতুদ দূর এর একটা বিহিত করার মনস্থ করলেন কুতুয। সেমতে তাকে গ্রেফতার করালেন তিনি। কুতুযের প্রশ্রয়ে সেই ডাইনি শাজারাতুদ দুরকে ছিন্নবস্ত্র করে কায়রোর রাজপথে ঘুরালো। অবশেষে খড়ম দিয়ে পিটিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে। (পৃষ্ঠা ৩৩)

এ বিষয়ে ঐতিহাসিক মাকরেজি লিখেছেন, মুইজ্জিয়া মামলুকরা ইযযুদ্দিনের হত্যার প্রতিশোধ নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল। তারা চাচ্ছিল শাজারাতুদ দুরকে হত্যা করতে। নুরুদ্দিন ক্ষমতায় আরোহনের পর শাজারাতুদ দুরকে নুরুদ্দিনের মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। তার আদেশে দাসীরা শাজারাতুদ দুরকে হত্যা করে। (৪)

মাকরেজির বক্তব্য থেকে বুঝা যায়, মুইজ্জিয়া মামলুকরা প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছিল, আর নুরুদ্দিন ক্ষমতায় আসার পর শাজারাতুদ দুরকে হত্যা করা সহজ হয়। বলে রাখা ভালো কুতুয তখনো পুরোদস্তুর শাসক হননি, তিনি ছিলেন নুরুদ্দিনের অভিভাবক। এই হত্যাকান্ড নুরুদ্দিনের শাসনকালের শুরুর দিকেই সংঘঠিত হয়েছিল, তখনে পরিস্থিতি কুতুযের নিয়ন্ত্রনে আসেনি। তাই কুতুয এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছেন সরাসরি একবাক্যে বলে দেয়াটা বড় ধরনের ভুল।

ইবনুল ইমাদও তার গ্রন্থে শাজারাতুদ দুরের হত্যাকান্ডের সাথে কুতুযকে জড়াননি। (৫) ইবনে তাগরি বারদি আন নুজুমুয যাহিরা ফি তারিখি মিসর ওয়াল কাহিরা গ্রন্থে শাজারাতুদ দুরের হত্যাকান্ডের আলোচনা করেছেন। কিন্তু সেখানেও এর সাথে কুতুযের সংশ্লিষ্টতার আভাস নেই। (৬)

খাইরুদ্দিন যিরিকলি লিখেছেন, পিতার মৃত্যুর জন্য নুরুদ্দিন শাজারাতুদ দুরকে বন্দী করেন এবং তার মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেন। পরে তার আদেশে শাজারাতুদ দুরকে হত্যা করা হয়। (৭)

ড. আহমাদ খলিল জুমআ লিখেছেন, স্বামীর হত্যার প্রতিশোধ নিতে ইযযুদ্দিনের আগের স্ত্রী শাজারাতুদ দুরকে হত্যা করেন। (৮) এখানেও কুতুযকে জড়ানো হয়নি।

শাজারাতুদ দুরের জীবনিকার ড. নুরুদ্দিন খলিল লিখেছেন, নতুন সুলতানের আদেশে শাজারাতুদ দুরকে ইযযুদ্দিনের আগের স্ত্রীর কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। তিনি সাত বছর ধরে এমন সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলেন। শাজারাতুদ দুরের কারনে তার স্বামী তাকে ত্যাগ করেছিল। তিনি দাসীদের আদেশ দিলেন শাজারাতুদ দুরকে হত্যা করতে। (৯)

পরিস্থিতি বিশ্লেষনে বুঝা যায়, ইযযুদ্দিন আইবেকের হত্যার বদলা কিংবা ইযযুদ্দিনের আগের স্ত্রীর ক্ষোভ থেকেই শাজারাতুদ দুরকে হত্যা করা হয়। এর পেছনে কুতুযের উসকানি থাকার কোনো প্রমাণ ইতিহাস গ্রন্থসমূহে অনুপস্থিত।

হালাকুর পত্র পেয়ে কুতুয ভয় পাচ্ছিলেন?

৬৫৮ হিজরীতে হালাকু খান মিসরে সুলতান সাইফুদ্দিন কুতুযের কাছে একটি পত্র পাঠান। এই চিঠিতে হালাকু খান পরিস্কার হুমকি দিয়ে শর্তবিহীন আত্মসমর্পন করতে বলেছিল। আর নইলে যুদ্ধ ও মৃত্যুর হুমকি।

এই ঘটনা বর্ননা করতে গিয়ে দ্য প্যান্থার বইয়ের লেখক লিখেছেন, সুলতান কুতুজ রাগে অগ্নিমর্শা হলেও এর জবাবে কার্যকর কিছুই করলেন না। অবশ্য সে মুরোদ তার ছিলও না। (৫৫ পৃষ্ঠা)

লেখকের বক্তব্য থেকে বুঝা যায়, সাইফুদ্দিন হালাকুর পত্র দেখে ভীত হয়েছিলেন। তার মধ্যে দৃঢ়তাও ছিল না। এবার দেখা যাক ইতিহাসগ্রন্থগুলো কী বলে?

আল্লামা মাকরেজি লিখেছেন, হালাকুর পত্র পেয়ে কুতুয আমিরদের সাথে পরামর্শ করেন। আমিররা তাতারীদের মোকাবেলা করতে ভয় পাচ্ছিল। তারা চাচ্ছিল না তাতারীদের মুখোমুখি হতে। সাইফুদ্দিন কুতুয তখন আমিরদের উদ্দেশ্য করে বলেন, হে মুসলমান নেতারা, আপনারা দীর্ঘদিন বাইতুল মালের সম্পদ গ্রহন করেছেন।

আর এখন যুদ্ধে যেতে আপনারা অনাগ্রহী। আমি জিহাদে যাচ্ছি। যে জিহাদ কামনা করে, সে আমার সাথী হতে পারে। অন্যথায় সে ঘরে বসে থাকুক,নিশ্চয় আল্লাহ তাকে দেখবেন। মুসলমানদের সম্মানহানীর গুনাহ জিহাদ থেকে বিরত থাকা লোকদের ওপর বর্তাবে। কুতুযের কথা শুনে আমিরদের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। রাতেরবেলা কুতুয ঘোড়ায় আরোহন করলেন, সবাইকে বললেন আমি একাই তাতারীদের সাথে লড়াই করতে যাবো। (১০)

মাকরেজির বর্ননা থেকে পরিস্কার বুঝা যায়, সভাসদ ও আমিররা তাতারীদের সাথে লড়তে না চাইলেও কুতুয তাতারীদের সাথে সরাসরি যুদ্ধ চাইছিলেন। এমনকি তিনি বলেছেন, তিনি একাই তাতারীদের বিরুদ্ধে লড়বেন! অথচ তার সম্পর্কে লেখা হয়েছে, তার কার্যকর কিছু করার মুরোদ ছিল না।

মুহাম্মাদ বিন আহমাদ বিন ইয়াস হানাফী লিখেছেন, হালাকুর পত্র পেয়ে কুতুয তার সভাসদদের সাথে বৈঠকে বসেন। তিনি তাদের বলেন, যদি তোমরা তাদের মোকাবিলা করতে এগিয়ে না যাও তাহলে শীঘ্রই তারা তোমাদের শহর দখল করে নিবে। তারা বাগদাদে যা করেছে আমাদের সাথেও তা করবে। এরপর তিনি হালাকুর দূতদেরকে বন্দী করেন এবং জিহাদের ঘোষণা দেন। (১১)

রশিদুদ্দিন ফজলুল্লাহ হামদানি লিখেছেন, হালাকুর পত্র পেয়ে কুতুয পরামর্শসভা আহবান করেন। একজন সভাসদ বলে উঠে, হালাকু খান চেংখিজ খানের নাতী। ইতিমধ্যে সে এক বিশাল ভূখন্ড জয় করেছে। আমরা যদি তার কাছে গিয়ে নিরাপত্তা প্রার্থনা করি তাহলে এতে দোষের কিছু নেই। এই কথা শুনে কুতুয বলেন, নাহ। আমরা তাতারীদের বিরুদ্ধে জিহাদেই যাচ্ছি। (১২)

ড. আলী সাল্লাবি লিখেছেন, সভাসদদের পরামর্শ শুনে কুতুয বললেন, আমার সিদ্ধান্ত হলো, আমরা সবাই একসাথে জিহাদে যাব। যদি আমরা বিজয়ী হই, তাহলে আমাদের উদ্দেশ্য অর্জিত হবে। আর পরাজিত হলেও আমরা মানুষের কাছে অপদস্থ হবো না। (১৩)

বর্ননাগুলো থেকে পরিস্কার অন্য সভাসদরা তাতারিদের ভয় পেলেও কুতুয বিন্দুমাত্র ভয় পাচ্ছিলেন না। মূলত সেই সভায় তিনি এবং বাইবার্স দুজনের কেউই তাতারীদের ভয় পাচ্ছিলেন না। এবং তারা তাতারীদের বিরুদ্ধে নিজেরাও জিহাদে বের হয়েছিলেন, আমিরদেরকেও বের করিয়েছিলেন।

কুতুয কি সত্যিই আইন জালুত থেকে পালাতে চাচ্ছিলেন?

২৫ রমজান ৬৫৮ হিজরীতে আইন জালুত ময়দানে মুসলিম বাহিনী তাতারী বাহিনীর মুখোমুখি হয়। এ যুদ্ধের বর্ননা দিতে গিয়ে দ্য প্যান্থার বইয়ের লেখক লিখেছেন, পরাজয় অবশ্যাম্ভাবী দেখে হতাশ কুতুজ মাথা থেকে শিরস্ত্রাণ ছুড়ে দিয়ে পালাবার পথ খুজছিলেন। কিন্তু শিরস্ত্রাণ খুলে ফেলায় সৈন্যরা তাকে চিনে ফেলে, তাই সুলতান কুতুজ চক্ষুলজ্জায় ‘হায় আমার ইসলাম’ বলে আর্তনাদ করে উঠেন এবং সৈন্যদের চিৎকার করে দৃঢ়পদে লড়ে যাওয়ার আহবান করেন কিন্তু সবই বৃথা যায়। (৬১ পৃষ্ঠা)

পুরো বইয়ের সবচেয়ে আপত্তিকর জায়গা এটি। এটি সরাসরি সত্যের বিপরীত তথ্য। এর মাধ্যমে সাইফুদ্দিন কুতুযকে কলুষিত করার চেষ্টা চালানো হয়েছে। অবশ্য এ তথ্যটি এতটাই হাস্যকর, পাঠক একটু চিন্তা করলেই ভুল ধরে ফেলতে পারবে। প্রথমত, যে সেনাপতি যুদ্ধের ময়দান থেকে পালাবেন, তিনি শিরস্ত্রাণ খুলে সবাইকে চেহারা দেখিয়ে পালাবেন, এটা হাস্যকর। দ্বিতীয়ত, পালানোর সময় তিনি ওয়া ইসলামাহ বলে চিৎকার করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন, এটাও মেনে নেয়ার মত নয়।

এবার ঐতিহাসিকদের বক্তব্য দেখে আসা যাক।

ঐতিহাসিক মাকরেজি লিখেছেন, তাতারী বাহিনীর তীব্র হামলায় সুলতানের বাহিনী কেপে উঠলো। তখন সুলতান কুতুয তার শিরস্ত্রাণ খুলে মাটিতে ফেলে দিলেন। চিৎকার করে বললেন, ওয়া ইসলামাহ। তারপর তিনি সেনাদের কাতারে নেমে আসেন। এবং শক্তিশালী হামলা করেন। এরপর আল্লাহর সাহায্য নেমে আসে। তাতারী সেনাপতি কুতবুগা নিহত হয়। (১৪)

আবদুল্লাহ সাইদ মুহাম্মদ সাফির গামেদি লিখেছেন, যুদ্ধের ময়দানে মুসলমানরা ক্রমশ কোনঠাসা হয়ে পড়ছিল। এসময় কুতুয চিৎকার করে তিনবার ওয়া ইসলামাহ বলেন। তারপর তিনি বলেন, হে আল্লাহ আপনার বান্দা কুতুযকে তাতারীদের মোকাবেলায় সাহায্য করুন। এই বলে তিনি সেনাদের মাঝে নেমে আসেন।তাকে দেখে সেনাদের মনোবল বৃদ্ধি পায়। তারা তাতারিদের উপর প্রচন্ড আঘাত হানে। (১৫)

ফায়েদ হাম্মাদ মুহাম্মদ আশুর লিখেছেন, সাইফুদ্দিন কুতুয ওয়া ইসলামাহ বলে ময়দানে নেমে আসেন। তার এই হুংকারেই যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। (১৬)

কুতুয সম্পর্কে অনুরুপ তথ্যই দিয়েছেন আলি মোহাম্মদ আস সাল্লাবি (১৭) ও ড. কাসেম আবদুহু কাসেম(১৮).

দেখা যাচ্ছে, যে ঘটনাটি ছিল কুতুযের সাহসিকতার অনুপম দৃষ্টান্ত, যে ঘটনার ফলে যুদ্ধের গতিপথ পালটে গিয়েছিল, লেখক তাকেই ব্যবহার করেছেন কুতুযের বিরুদ্ধে। লিখেছেন কুতুয পালাতে চাচ্ছিলেন।

কুতুযের হত্যাপ্রসংগে

দ্য প্যান্থার বইয়ের লেখক লিখেছেন, কুতুযকে দুজন মামলুক হত্যা করেছে। (৬৬ ও ৬৭ পৃষ্ঠা)। ৬৭ পৃষ্ঠায় এ তথ্য লিখে তিনি রেফারেন্স দিয়েছেন মাকরেজির আস সুলুক লিমারিফাতি দুওয়ালিল মুলুক গ্রন্থের। অথচ মাকরেজির সেই গ্রন্থের ১ম খন্ডের ৫১৯ পৃষ্ঠায় পরিস্কার লেখা আছে কুতুযকে বাইবার্স হত্যা করেছেন।

এ বিষয়ে লম্বা আলোচনায় যাবো না। শুধু কিছু বই ও পৃষ্ঠা নাম্বার দিয়ে দিচ্ছি। আগ্রহী পাঠক মিলিয়ে নিতে পারবেন। সবাই লিখেছেন কুতুযকে বাইবার্সই হত্যা করেছেন।

১। তারিখুল ইসলাম, ৪৮/৩৫৫– ইমাম যাহাবী।
২।আনু নুজুমুজ জাহিরা, ৭/১০২– ইবনে তাগরি বারদি।
৩। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৭/৪০৪– ইবনে কাসির।
৪। তারিখ ইবনে খালদুন, ৫/৪৩– ইবনে খালদুন।
৫। আর রওযুয যাহির ফি সিরাতিল মালিকিজ জাহির, ৬৮ পৃষ্ঠা– মুহিউদ্দিন বিন আব্দুজ জাহের
৬। হায়াতুল মালিকিজ জাহির বাইবার্স, ৮৩ পৃষ্ঠা– মাহমুদ শিবলী।
৭। আস সুলতানুল মুজাফফর সাইফুদ্দিন কুতুয বাতালু মারিকাতি আইনি জালুত, ১৪৬ পৃষ্ঠা– ড. কাসেম আবদুহু কাসেম।
৮। আস সুলতান সাইফুদ্দিন কুতুয ওয়া মারিকাতু আইনি জালুত, ১২৯ পৃষ্ঠা– আলি মুহাম্মদ আস সাল্লাবি।

শেষ কথা
প্যান্থার সম্পর্কে লেখার উদ্দেশ্য ছিল এই বইয়ে থাকা ভুলগুলো সম্পর্কে পাঠকদের সচেতন করা। ইতিমধ্যে প্রকাশনী কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে ভেবেছেন। তারা জানিয়েছেন, অচিরেই যোগ্য কাউকে দিয়ে বইটি সম্পাদনা করানো হবে। তাদের এ পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানাই। একইসাথে আমরা আশা করবো, ভবিষ্যতে যে কেউ, যেকোনো বই প্রকাশের আগে বইয়ের বানান ও ভাষারীতির পাশাপাশি বইয়ের তথ্যগুলোও নিরীক্ষণ করে নিবেন।

সূত্র
—————–
১। আস সুলুক লি মারিফাতি দুওয়ালিল মুলুক, ১ম খন্ড, ৪৫৭/৪৫৮ পৃষ্ঠা– আল্লামা মাকরেজি। দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত।
২। হুসনুল মুহাদারা ফি তারিখি মিসর ওয়াল কাহিরা, ২য় খন্ড, ৩৬ পৃষ্ঠা– জালালুদ্দিন সুয়ুতী। দার এহইয়ায়িল কুতুবিল আরাবী।
৩। ক)তারিখুল ইসলাম ওয়া ওফায়াতুল মাশাহিরি ওয়াল আলাম, ৪৮শ খন্ড, ২৮ পৃষ্ঠা– হাফেজ শামসুদ্দিন যাহাবী। দারুল কুতুবিল আরাবি, বৈরুত।
খ)আস সুলুক লি মারিফাতি দুওয়ালিল মুলুক, ১ম খন্ড, ৪৯৪পৃষ্ঠা– আল্লামা মাকরেজি। দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত।
৪। আস সুলুক লি মারিফাতি দুওয়ালিল মুলুক, ১ম খন্ড, ৪৯৪পৃষ্ঠা– আল্লামা মাকরেজি। দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত।
৫। শাজারাতু যাহাব ফি আখবারি মান যাহাব, ৭ম খন্ড, ৪৬৪ পৃষ্ঠা– ইবনুল ইমাদ। দার ইবনে কাসির, বৈরুত।
৬। আন নুজুমুয যাহিরা ফি মুলুকি মিসর ওয়াল কাহিরা, ৭ম খন্ড, ৫৬ পৃষ্ঠা– ইবনে তাগরি বারদি।
৭। আল আ’লাম, ৩য় খন্ড, ১৫৬ পৃষ্ঠা– খাইরুদ্দিন যিরিকলি।
৮। নিসাউন ফি কুসুরিল উমারা, ২১৬ পৃষ্ঠা– ড আহমাদ খলিল জুমআ। আল ইয়ামামা, দামেশক।
৯। শাজারাতুদ দূর, ৮৬ পৃষ্ঠা– ড নুরুদ্দিন খলিল।
১০। আস সুলুক লি মারিফাতি দুওয়ালিল মুলুক, ১ম খন্ড, ৫১৫ পৃষ্ঠা– আল্লামা মাকরেজি। দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত।
১১। বাদাইয়ূয যুহুর ফি ওয়াকাইয়ূদ দুহুর, ১ম খন্ড, ৩০৫ পৃষ্ঠা– মুহাম্মাদ বিন আহমাদ বিন ইয়াস হানাফি।
১২। জামিউত তাওয়ারিখ, ১ম খন্ড, ৩১১ পৃষ্ঠা– রশিদুদ্দিন ফজলুল্লাহ হামদানি।
১৩। আস সুলতান সাইফুদ্দিন কুতুয ওয়া মারিকাতু আইনি জালুত, ১১৬ পৃষ্ঠা– ড আলি সাল্লাবি।
১৪। আস সুলুক লি মারিফাতি দুওয়ালিল মুলুক, ১ম খন্ড, ৫১৬ পৃষ্ঠা– আল্লামা মাকরেজি। দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত।
১৫। জিহাদুল মামালিক দিদ্দুল মগুল ওয়াস সলিবিয়্যিন, ১২৩ পৃষ্ঠা– আবদুল্লাহ সাইদ মুহাম্মদ সাফির গামেদি
১৬। আল জিহাদুল ইসলামি দিদ্দুস সলিবিয়্যিন ওয়াল মুগল ফিল আসরিল মামলুকি, ১১২ পৃষ্ঠা- ফায়েদ হাম্মাদ মুহাম্মদ আশুর
১৭। আস সুলতান সাইফুদ্দিন কুতুয ওয়া মারিকাতু আইনি জালুত, ১২২ পৃষ্ঠা– আলি মুহাম্মদ আস সাল্লাবি।
১৮। আস সুলতানুল মুজাফফর সাইফুদ্দিন কুতুয বাতালু মারিকাতি আইনি জালুত, ১৩১ পৃষ্ঠা– ড. কাসেম আবদুহু কাসেম।

Facebook Comments

1 Comment

  1. আরেফিন রায়হান Reply

    এই ভুলগুলো পরে সংশোধন করা হয়েছিল?

Write A Comment