বুক রিভিউ

দ্যা প্যান্থার ও ভ্রান্তি নিরসন, পর্ব-১

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

শুরুর কথা

দ্য প্যান্থার বইটি প্রকাশের পর থেকেই সংগ্রহের ইচ্ছা ছিল। বাংলা ভাষায় মামলুক সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্সের জীবন নিয়ে এত বিস্তৃত কাজ আগে হয়নি। বইটি সংগ্রহ করবো ভেবেও করা হচ্ছিল না। এদিকে বিভিন্ন সময় পরিচিত অনেককে সাইফুদ্দিন কুতুয, আইনে জালুত ও বাইবার্স সম্পর্কে ভুল তথ্য ছড়াতে দেখি। প্রায় সবার সাথে আলাপ করে দেখি, উনারা দ্যা প্যান্থার বইটি থেকেই এসব তথ্য সংগ্রহ করেছেন। এই বইকে তারা ইতিহাসের আকরগ্রন্থ ভেবে বসে আছেন। বইটি সংগ্রহ করি। পড়তে গিয়ে দেখি লেখক একের পর এক বানোয়াট তথ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। বাইবার্সের গুন গাইতে গিয়ে ছোট করছেন সাইফুদ্দিন কুতুয ও সালাহুদ্দিন আইয়ুবীর মত মহানায়কদের। ইবনে কাসীর, ইবনে খালদুন, যাহাবী, মাকরেজি, সুয়ুতীর মত ঐতিহাসিকদের বর্ণিত তথ্য ফেলে নিজের মনগড়া তথ্য পরিবেশন করছেন। বিষয়টি নিয়ে প্রকাশকের সাথে আলাপ করলে তিনি জানান, পরের সংস্করণে এসব ভুল সংশোধন করা হয়েছে। এরপর আমি আগস্ট ২০১৮ তে প্রকাশিত সর্বশেষ সংস্করণ সংগ্রহ করি। পুরোটা আবার পড়ি। দুই একটা জায়গায় পরিবর্তন আসলেও বেশিরভাগ জায়গা আগেরমত অপরিবর্তিত। ইতিহাসের একজন পাঠক হিসেবে আমার মনে হয়েছে, এই বিষয়ে আলোচনা প্রয়োজন। অন্তত ইতিহাসের মৌলিক গ্রন্থসমূহের উদ্ধৃতি তুলে দরকার। লেখক ইতিহাসের মোড়কে যে কালো পর্দা লেপ্টে দিয়েছেন, তা সরানো উচিত। সেই চিন্তা থেকেই এই লেখা। এটি বইয়ের উপর কোনো রিভিউ নয়। বইয়ে উল্লেখিত কিছু ভুল তথ্যের সংশোধন মাত্র। সুতরাং, ‘বইটির অনেক ইতিবাচক দিকও তো আছে’ এমন প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।

গ্রন্থপঞ্জি প্রসংগে

বইয়ের শেষে লেখক যেসব বই থেকে সাহায্য নিয়েছেন তার একটি তালিকা দিয়েছেন। এ সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করা দরকার।

১। ইবনে খালদুনের আল মুকাদ্দিমা। সচেতন পাঠক জানেন আল মুকাদ্দিমা কোনো গতানুগতিক ইতিহাসগ্রন্থ নয়। বরং এটি ইবনে খালদুন রচিত ইতিহাসগ্রন্থ কিতাবুল ইবারের ভূমিকা হিসেবে লেখা। এই গ্রন্থে ইবনে খালদুন সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসতত্ত্বের ব্যখ্যা দিয়েছেন। এই গ্রন্থে রুকনুদ্দিন বাইবার্সের ইতিহাস নেই। বাইবার্স সম্পর্কে তিনি লিখেছেন কিতাবুল ইবারে। অর্থাৎ প্যান্থার বইয়ের লেখক গ্রন্থপঞ্জিতে এই বইয়ের নাম উল্লেখ করলেও এখান থেকে বাইবার্স সম্পর্কে কোনো তথ্য নেয়ার সুযোগ তার ছিল না। তবে নগররাষ্ট্র ও বিভিন্ন অঞ্চলের সংস্কৃতি সম্পর্কে তথ্য নিতে পারেন।

২। ইসলামি বিশ্বকোষ, ১ম খন্ড। এই খন্ডে মামলুক সালতানাত, কুতুয, আইয়ুবী, বাইবার্স কারো সম্পর্কেই আলোচনা নেই। সুতরাং লেখক তার বইতে এই গ্রন্থ থেকেও খুব বেশি তথ্য নিতে পারেননি, এটা নিশ্চিত।

৩। সিরাতুজ জাহির বাইবার্স। জামাল আল গাইতানি লিখিত বাইবার্সের জীবনি। ৫ খন্ডে রচিত বাইবার্সের বৃহদাকার জীবনি। এই গ্রন্থ থেকে লেখক তথ্য নিয়েছেন সত্য কিন্ত এখানকার অনেক তথ্য বাদ দিয়ে নিজের মনগড়া তথ্য পরিবেশন করতেও তিনি দ্বিধা করেননি। অর্থাৎ, অনেক জায়গাতেই এই গ্রন্থের বিপরীত তথ্য দিয়েছেন।

৪। তারিখুর রুসুল ওয়াল মুলুক। ইবনে জারীর তাবারী রচিত ইতিহাসগ্রন্থ। ইবনে জারীর তাবারী ইন্তেকাল করেছেন ৩১০ হিজরীতে। ৯২৩ খ্রিস্টাব্দে। অর্থাৎ তিনি রুকনুদ্দিন বাইবার্সের প্রায় ৩৫০ বছর আগের লোক। সুতরাং তার লিখিত ইতিহাসগ্রন্থ থেকে বাইবার্সের জীবনি চয়নের কোন সুযোগ নেই। মূলত লেখক শিয়াদের আলোচনার সময় এই গ্রন্থ থেকে দুটি তথ্য নিয়েছেন বলে দেখা যায়। ১২৭ পৃষ্ঠায় ও ১২৮ পৃষ্ঠায় তিনি এই বইয়ের রেফারেন্স দিয়েছেন। মজার ব্যাপার হলো, ১২৮ পৃষ্ঠায় লেখক কারামাতিদের মক্কা আক্রমনের ঘটনা লিখে এই বইয়ের রেফারেন্স দিয়েছেন। অথচ কারামতিরা মক্কা আক্রমন করেছিল ৩১৭ হিজরী তথা ৯৩০ খ্রিস্টাব্দে। অর্থাৎ ইবনে জারির তাবারীর ইন্তেকালের ৭ বছর পর। সম্ভবত বিজ্ঞ লেখক এই গ্রন্থটি খুলেও দেখেননি। খুললে দেখতে পেতেন ইবনে জারির তাবারী তার গ্রন্থে ৩০২ হিজরীর পর আর আলোচনা করেননি। সম্ভবত লেখক অন্য সোর্স থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। পরে গ্রহনযোগ্যতা বাড়াবার জন্য তাবারীর বইটির নাম উল্লেখ করেছেন।

৫। তারিখুল মালিক আজজাহির। ইযযুদ্দিন ইবনে শাদ্দাদ রচিত বাইবার্সের জীবনি। এই বই থেকে লেখক কিছু তথ্য নিয়েছেন।

৬। হুসনুল মুহাদারা ফি তারিখি মিসর ওয়াল কাহেরা। জালালুদ্দিন সুয়ুতী রচিত ইতিহাসগ্রন্থ। যদিও বইটির নাম অশুদ্ধ লেখা হয়েছে তবু আমাদের ধারণা এটা টাইপিং মিসটেক। আমাদের অনুসন্ধানে দেখেছি, লেখক এই বই থেকেও তথ্য নেননি। বরং এই বইয়ের বিপরীত তথ্যই দিয়েছেন তার লেখায়। এ বিষয়ে সামনে আলোচনা করা হবে।

৭। Sultan Baibars & Mamluks নামের ফেসবুক পেজ। এই পেজে বাইবার্সের জীবন নিয়ে বিস্তৃত কাজ হয়েছে। দ্য প্যান্থার এর লেখক যেখানেই ভুল তথ্য দিয়েছেন সেখানেই এই পেজে বর্নিত তথ্যের সাথে মিলে গেছে। যা থেকে বুঝা যায়, লেখক এই পেজের তথ্যকে হুবহু অনুসরণ করেছেন, ইতিহাসগ্রন্থ খুলে দেখার প্রয়োজন অনুভব করেননি।

৮। সমসাময়িক বিভিন্ন প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও ফিচার। বলতে দ্বিধা নেই , খুবই অস্পষ্ট রেফারেন্স।

বইয়ের ভেতরে কয়েক জায়গায় আল্লামা মাকরেজির আস সুলুক লিমারিফাতি দুওয়ালিল মুলুক গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। যদিও বইটির নাম ভুল ছিল এবং আমরা ধারনা করছি তা টাইপিং মিসটেক, তবু যদি উদ্ধৃতি সঠিক হত তাহলে সান্ত্বনা ছিল। কিন্তু আফসোস, লেখক মাকরেজি বর্নিত তথ্যের বিপরীত তথ্য দিয়ে মাকরেজির উদ্ধৃতি দিয়েছেন। এ বিষয়ে সামনে আলোচনা আসবে। ইনশাআল্লাহ।

বই প্রসংগে

বইটি পড়ে মনে হয়েছে লেখক বাইবার্সের প্রতি অতিরিক্ত দূর্বল। তিনি বাইবার্সের প্রশংসা করার পাশাপাশি অন্যদের নামে মিথ্যা ছড়িয়েছেন , তাদের ছোট করেছেন। অথচ একজন লেখক, গবেষকের কাজ হলো সত্য তুলে ধরা। কাউকে ছোট করা কিংবা কাউকে বড় করা নয়।
লেখক এই বইতে যেখানে যেখানে ভুল তথ্য দিয়েছেন, তার একটা সংক্ষিপ্ত তালিকা নিম্মরুপ-

১। সালাহুদ্দিন আইয়ুবীর অবদান খাটো করে দেখানো।
২। শাজারাতুদ দুরের হত্যাকান্ড সম্পর্কে ভুল তথ্যদান।
৩। আইন জালুত যুদ্ধ সম্পর্কে ভুল তথ্য দেয়া।
৪। সাইফুদ্দিন কুতুযের নামে মিথ্যাচার ও তাকে কাপুরুষ প্রমাণের চেষ্টা।
৫। ফারিসুদ্দিন আকতাইয়ের হত্যাকান্ড সম্পর্কে ভুল তথ্যদান।
৬। সাইফুদ্দিন কুতুযের হত্যাকান্ড সম্পর্কে ভুল তথ্যদান।

এগুলো হলো মোটাদাগে লেখকের কিছু ভুল। এছাড়াও বইয়ের বিভিন্ন জায়গায় আরো অনেক ভুল, বিকৃত তথ্য আছে, যা নিয়ে আলাপ করতে গেলে লেখা অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। যেমন, ১৩২ পৃষ্ঠায় লেখা আছে, দরসে নেজামির উদ্ভাবক হলেন নিযামুল মুলক। ( এ বিষয়ে জানতে চাইলে দেখতে পারেন — https://www.facebook.com/notes/imran-raihan/দরসে-নেজামির-প্রণেতার-খোঁজে/654055998275338/)। ৫৪ পৃষ্ঠায় লেখা আছে, কুতুযের কাছে কিতবুগা পত্র পাঠিয়েছেন। অথচ পত্রটি পাঠিয়েছিল হালাকু খান। (এ বিষয়ে জানতে আন নুজুমুয যাহিরা ফি মুলুকি মিসর ওয়াল কাহিরা, আস সুলুক লি মারিফাতি দুওয়ালিল মুলুক ইত্যাদী গ্রন্থ দেখা যেতে পারে)। ১৫৭ পৃষ্ঠায় সুলতান নুরুদ্দিন যিংকির যে স্বপ্নের ঘটনা আলোচনা করা হয়েছে, গবেষকদের কাছে তার সত্যতা প্রশ্নবিদ্ধ (বিস্তারিত জানতে দেখুন ড. আলী মোহাম্মদ আস সাল্লাবী প্রণিত আদ দাওলাতুয যিংকিয়্যাহ)। এখানে সবগুলো বিষয়ই জরুরী নয় তাই দীর্ঘ আলাপ এড়িয়ে আমরা শুধু জরুরী কয়েকটি বিষয়েই আলোচনা করবো। ইনশাআল্লাহ।

বইয়ের শুরুতে প্রকাশক লিখেছেন, ‘তথ্যগত ব্যাপারে কিছুটা বিতর্ক থাকা স্বাভাবিক। কারণ ঐতিহাসিক কোনো বিষয়ে একাধিক মত থাকতেই পারে’। এই বই সম্পর্কে এমন কথা আরো অনেকেই বলে থাকেন।

এজন্য লেখাটি কয়েক পর্ব দীর্ঘ হবে। লেখকের ভুলগুলো যে একাধিক মতের অংশ নয় বরং নিছকই মনগড়া তথ্য, তা প্রমাণ করা হবে। ইনশা আল্লাহ।

Facebook Comments

Write A Comment