মহামারির দিনগুলোতে জ্বিন

‘সময় ঠিক মনে নেই। তবে ১৯৬১ বা ৬২ সালের কথা’, বলে থামলেন আবু বকর নানা।
আমরা বসে আছি নানা বাড়ির পুকুরঘাটে। সময়টা মাগরিবের পর। খুব দ্রুত রাত নেমে এসেছে। পুকুর পাড়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোকে দেখাচ্ছে ভৌতিক অবয়বের মত। বাতাসে একটা মিষ্টি সুবাস ভেসে আছে। নানাদের পুকুরের ঘাট শানবাঁধানো। নানা একপাশে বসেছেন, অন্যপাশে আমি ও রুবেল। রুবেলের আবদার ছিল নানা যেন নিজের অভিজ্ঞতা থেকে ভৌতিক কোনো গল্প শুনান। সকাল থেকে এই নিয়ে নানার সাথে আলাপ চলেছে তার। শুরুতে নানা রাজি না হলেও মাগরিবের নামাজের পর বললেন, ঠিক আছে বলবো। পুকুরঘাটে আয়। মসজিদ থেকে সোজা পুকুরঘাটে চলে এলাম আমরা।
‘আপনার বয়স কত তখন?’ রুবেল জিজ্ঞেস করে।
‘বয়স ২০/২১ হবে। ঢাকা আলিয়ায় পড়ি তখন। কোনো কারণে মাদরাসা বন্ধ ছিল। বাড়ি এলাম ছুটি কাটাতে। আব্বা তখন আমার উপর বেশ রাগ। আমার আলিয়া মাদরাসায় পড়ার সিদ্ধান্তে তার দ্বিমত ছিল। তিনি ছিলেন দেওবন্দ পড়ে আসা মানুষ। হুসাইন আহমাদ মাদানির ছাত্র। সে সময় আলিয়া মাদরাসাতে কওমি বড় বড় আলেমরা পড়াতেন। ছাত্রদের আমল আখলাকও এখনকার চেয়ে অনেক ভালো ছিল। আব্বাজান নিজেও চৌমুহনী আলিয়াতে পড়িয়েছেন দীর্ঘ সময়। কিন্তু তবু তিনি আলিয়া মাদরাসাকে অপছন্দ করতেন। আমি আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার পর অনেকদিন তিনি আমার সাথে কথা বলেননি।
ছুটি কাটাতে বাড়ি এসে দেখি আব্বাজান আগের চেয়ে কিছুটা নরম হয়েছেন। তবু সম্পর্কের টানাপোড়েন রয়েই গেল। সারাদিন তিনি মসজিদ মাদরাসা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। রাতে ঘরে ফিরলে সামান্য কথা হয়। সে সময় তিনি ফুনুনাতের বিভিন্ন কিতাবাদি থেকে প্রশ্ন করেন। শরহে তাহযিব, কুতবি, সুল্লামুল উলুম, মোল্লা হাসান, মাইবুজি, শামসে বাজেগা এসব কিতাব সামনে এনে বলেন পড়ে অর্থ করতে। বেশিরভাগ সময় আমি ব্যর্থ হই। আব্বাজানের চেহারায় হতাশা বাড়ে। দেখতে দেখতে আমার ছুটি প্রায় শেষ হয়ে এল। মাদরাসায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছি এ সময় বাধল বিপত্তি। পুরো গ্রামে দেখা গেল কলেরা।
কলেরা এখন উল্লেখযোগ্য কোনো রোগ নয়। অন্তত গত বিশ ত্রিশ বছরেও কারো কলেরা হতে শুনিনি। কিন্তু তখন এসব ছিল মহামারি। যেই এলাকায় কলেরা, যক্ষ্মা, গুটিবসন্ত একবার হানা দিত পুরো এলাকা সাফ হয়ে যেত। আমার ছোটবেলায় হরিনকাটার ওদিকে একবার গুটিবসন্তে পুরো এলাকা সাফ হয়ে যায়। পরে লোকজনের কাফন দাফনের জন্য আশপাশের গ্রাম থেকে মানুষ যেতে হয়। সে সময় কয়েক বছর পরপরই কোনো না কোনো মহামারী হানা দিত। শূন্য হয়ে যেত গ্রামের পর গ্রাম। অনেকে পালিয়ে নতুন এলাকায় বসতি গড়তো।
গ্রামে কলেরা প্রবেশের কদিনের মধ্যেই ১৫/২০ জন মারা গেল। আমার মাদরাসা খুলে গেল কিন্তু আব্বাজান যেতে নিষেধ করলেন। মহামারী কবলিত এলাকা ত্যাগ করে অন্যত্র যাওয়ার ক্ষেত্রে হাদিসে যে নিষেধ আছে তিনি তা শক্তভাবে মেনে চলতেন। অগত্যা আমি বাড়িতেই রয়ে গেলাম। যেহেতু চারদিকে মহামারি তাই বাইরে বের হই না, সারাদিন ঘরে বসে থাকি। এদিকে আব্বাজানের সামান্য বিশ্রামের সুযোগ নেই। সারাদিন লোকজন এসে বসে থাকে পানি পড়া নেয়ার জন্য। তিনি পানি পড়া দিয়ে শেষ করতে পারেন না। মাঝে মাঝে আমাকেও ডেকে নেন ফু দিতে। ঘরের সবাইকে মহামারির দোয়া শিখিয়ে দেয়া হয়েছে। আব্বাজান প্রতিদিন তদারকি করেন আমল করা হচ্ছে কিনা। ফজরের পর ঘরের সবাই একসাথে বসে দোয়া পড়ি।
প্রতিদিনই নতুন নতুন মৃত্যুর সংবাদ আসে। আব্বাজান প্রায়ই জানাজা পড়াতে যান। ফিরে আসেন গোমড়া মুখে। মৃতদের কেউ তার বন্ধু, কেউ উস্তাদ, কেউবা আত্মীয়। রাতে তিনি মৃতদের স্মৃতিচারণ করেন। এর মধ্যে বড় দুলাভাই মানে ইমরানের নানা এলেন আমাদের বাড়িতে। বড় আপার বিয়ে হয়েছে তখনো এক বছর পার হয়নি। উনি সরকারি আমিন ছিলেন। জমি জায়গার কাজে বিভিন্ন এলাকায় যেতে হত। জমির কাজ শেষ হলে নগদ অর্থের পাশাপাশি অনেক কিছু উপহার দিত লোকে। প্রায়ই সেসব উপহার নিয়ে চলে আসতেন শ্বশুরবাড়ি। একবার বিশ কেজি ওজনের এক বোয়াল নিয়ে এলেন আমাদের বাড়িতে।
মহামারির মধ্যে তিনি এলেন দেখা করতে। জমির কাজে সেবারহাট গিয়েছিলেন। ভাবলেন ফিরতি পথে দেখা করে যাবেন। সে সময় তো যোগাযোগের এত উন্নত ব্যবস্থা নেই, মহামারির কথা জানতেন না তিনি। গ্রামে ঢুকতেই মহামারির কথা জেনে গেলেন। কিন্তু ফিরে না গিয়ে তিনি আমাদের বাড়িতে এলেন। সম্ভবত মনে সংকোচ ছিল ফিরে গেলে আমরা কী ভাবি। আব্বাজান খুব রাগ করলেন। মহামারি জেনেও তিনি কেন এসেছেন এটা নিয়ে ধমকালেন। আব্বাজান সহজে রাগ না করলেও তিনি ছিলেন রাগি মানুষ। দুলাভাইকে বকাবকি করে বিদায় দেয়া হল। তবে দুলাভাই কিছু মনে করলেন না। আলেম হওয়ার কারণে আব্বাজানকে তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন।
যাই হোক, মহামারীর মাত্রা বাড়ছিল। সেনবাগ বাজার তখন অনেক ছোট, ভালো ডাক্তার নেই সেখানে। যারা আছে তাদের বেশিরভাগের জ্ঞান অভিজ্ঞতা নির্ভর। ছোটখাট জ্বর সর্দিতে এসব কাজে এলেও মহামারী ঠেকাতে এসব কার্যকর নয়। ডাক্তাররা নিজেরাও জানতেন সে কথা। ফলে তারাও নিজ উদ্যোগে কারো চিকিৎসা করতে যেতেন না। রোগীরাও তাদের প্রতি আগ্রহ না দেখিয়ে ঝাড়ফুঁকেই আস্থা রাখত। মহামারীর সময়টায় আব্বার ব্যস্ততা ছিল তাই সবার চেয়ে বেশি।
এলাকায় কিছু হিন্দু পরিবার ছিল। পরে ৭১ সালে এরা ভারতে চলে যায়। এরা মাঝে মাঝে বাবার কাছে এসে পানি পড়া নিত। ওদের কাছে শুনলাম এই রোগ নাকি নিয়ে এসেছে ওলাবিবি। তাদের বাড়িতে ওলাবিবির পূজাও চলছে। ওলাবিবি কে জানি না। আব্বাকে জিজ্ঞেস করতেই রেগে গেলেন। বললেন এসব ফালতু কথায় কান দিও না। মহামারীর মূল কারণ আল্লাহর গজব।
তখন পর্যন্ত আমাদের বাড়িতে কেউ কলেরা আক্রান্ত হয়নি। কিন্তু একদিন বিকালে জানলাম আমার এক চাচা কলেরা কারান্ত হয়েছেন। ক্রমেই অবস্থা খারাপ হচ্ছে তার। আব্বাজান তাকে দেখে এলেন, কিছুক্ষণ ঝাড়ফুঁক করলেন। রাতের বেলায় বাড়ির সবাইকে একত্র করে বললেন সবাই যেন বেশি দরুদ শরিফ আর দোয়া ইউনুস পড়তে থাকে। বয়স্কদেরকে দোয়া ইউনুসের পরিমাণ ভাগ করে দেয়া হলো। কেউ ৫ হাজার পড়বে, কেউ দশ হাজার। এভাবে প্রতিদিন এক লক্ষ পঁচিশ হাজার বার পড়া হলো। রাতে আব্বাজান হিসাব নিতেন সবাই পড়েছে কিনা। বাড়ির চারপাশে পড়া পানি ছিটানো হলো নিয়মিত। অসুস্থ চাচা মারা গেলেন না, তবে নতুন করে অসুস্থ হলো আরো কয়েকজন। এরমধ্যে একদিন ভোরে আবিষ্কার করলাম আমারও কলেরা হয়েছে। সকালে থেকে ঘন ঘন টয়লেটে যাচ্ছি। শরীর থেকে শুধু পানি বের হচ্ছে। দুপুরের মধ্যে শয্যাশায়ী হলাম। দুদিন কেটে গেল এ অবস্থায়। আব্বাজান আমল আরো জোরদার করেছেন। বেশিরভাগ সময় আমার পাশে এসে বসে থাকেন। তিলাওয়াত ও জিকির করেন।
সম্ভবত অসুস্থ হওয়ার তৃতীয় বা চতুর্থ রাতের ঘটনা। আমার রুমে একা শুয়ে আছি। কিছুটা ভ্যপসা গরম লাগছিল বলে জানালা খুলে দিয়েছি। বাইরে পূর্নিমার আলো। উঠান, উঠানের কোনে আমগাছ, একটু দূরে নুরুল ইসলাম ভাইদের ঘর সব দেখা যাচ্ছ’।
নানা কথা থামাতেই একটা পেঁচা ডেকে উঠে। রুবেল ভয় পেয়ে আমার গায়ে ঘেঁষে বসে। নানা বিষয়টা খেয়াল করলেও কিছু বললেন না। তিনি আবার নিজের কথা শুরু করলেন।
‘আমি জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছি। আচমকা দেখলাম আমাদের ঘরের পেছন দিক থেকে সাদা কাপড় পরা এক মহিলা বের হয়ে আসছে। উঠোনের মাঝ বরাবর হেটে যাচ্ছে সে। আমার মাথা ঠিক কাজ করছিল না। এত রাতে এই মহিলা কে হতে পারে তা ভাবছিলাম। আমাদের বাড়িতে পর্দার বিষয়টা আব্বাজান শক্তহাতে নিয়ন্ত্রণ করেন। এত রাতে কোনো মহিলা আমাদের উঠানে কেন আসবে তাও ভেবে পাচ্ছিলাম না। আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই দেখলাম মহিলাটি আমার দিকে ফিরে তাকিয়েছে। তার চেহারা দেখে চমকে গেলাম আমি। পুরো মুখে দগদগে ঘা। যে কেউ দেখলে শিউরে উঠতে বাধ্য। ভয়ে চিৎকার করতে যাচ্ছিলাম অনেক কষ্টে নিজেকে থামালাম। মহিলাটি তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তার দুচোখে ক্রোধ। দুচোখ যেন আগুণের মত জ্বলছে। তার চেহারায় এমন কিছু আছে যার কারণে ভয়ে আমার বুক কেঁপে গেল।
‘তোর আব্বার জন্য থাকতে পারলাম না। গেলাম গা’ হিসিয়ে উঠলো মহিলাটি। আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই উঠোনের কোনা ধরে অন্যদিকে চলে গেল সে। চিৎকার করে অজ্ঞান হলাম আমি।
সকালে জ্ঞান ফিরলে আব্বাজানকে খুলে বললাম পুরো ঘটনা। তিনি চিন্তিত চেহারায় আমার কথা শুনলেন কিন্তু কিছু বললেন না। কয়েকবার আয়াতুল কুরসি পড়ে আমার বুকে ফু দিলেন। সেদিন থেকে আমল আরো জোরদার করা হল। বেহেশতি জেওর দেখে আব্বাজান আরো কিছু আমল বের করলেন। সেগুলোও করতে থাকি আমরা। দুয়েকদিন পর খেয়াল করলাম মৃতের সংখ্যা কমে আসছে। আমিও সপ্তাখানেকের মধ্যে সুস্থ হয়ে যাই। পনেরো দিনের মধ্যে পুরো গ্রাম থেকে মহামারী কলেরা বিদায় নেয়।
পরে আমি অনেককে সেই মহিলার কথা বলেছি। সবাই বলেছে সে হলো ওলাবিবি। সে কলেরা নিয়ে আসে। অনেক সময় সে মহামারীর শুরুতে কাউকে দেখা দেয়, অনেকসময় শেষদিকে দেখা দেয়। আব্বাজানকে এসব বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি জবাব দেন এগুলো কুসংস্কার। হিন্দুদের কাছ থেকে জাহেল মুসলমানদের মধ্যে ছড়িয়েছে এসব। কয়েকদিন পর সুস্থ হলে ঢাকা চলে যাই। আমি আর এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর সুযোগ পেলাম না।
নানা কথা শেষ করলেন। রুবেল ইতিমধ্যে আমার জামার কোনা টেনে ধরে রেখেছে। নানা খেয়াল করলেন বিষয়টা। বললেন, ভয়ের কিছু নেই। চল ঘরে যাই।
ঠিক একই ধরণের গল্প শুনিয়েছেন আমার দূর সম্পর্কের জ্যাঠা রবিউল ইসলামও। তিনি থাকতেন নীলফামারীর ডোমারে। তিস্তার পাড়ে বসে এক সন্ধ্যায় তিনি শোনালেন এমন ঘটনা। সেটা পঞ্চাশের দশকের গল্প। গুটিবসন্ত হানা দিয়েছিল তাদের গ্রামে। মহামারীর শেষ দিকে এক রাতে তিনি এক ভয়াল দর্শন মহিলার দেখা পান যে তাকে বলেছিল, চলে যাচ্ছি। এরপর থেকে গ্রামের লোকজন সুস্থ হতে থাকে। জ্যাঠার ভাষ্যমতে সেই মহিলার নাম শীতলা। সে গুটিবসন্ত ছড়ায়।
এই দুটি ঘটনা আমাকে এমন দুজন মানুষ বলেছেন যারা নিজেরাই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। এছাড়া অন্যের মুখে শুনে আমাকে বলেছেন এমন লোকের সংখ্যা অনেক। গ্রামের সেই বৃদ্ধরা যারা নিজেদের কিশোর বা যৌবনকালে মহামারী দেখেছেন তাদের মুখে এমন অনেক ঘটনাই শোনা যায়। ঘুরেফিরে ঘটনাগুলোর প্যাটার্ন একই। মহামারী চলাকালে ভয়ানক চেহারার কোনো মহিলাকে দেখা যাচ্ছে, সেই মহিলা কাউকে ভয় দেখাচ্ছে বা কোনো নির্দেশনা দিচ্ছে। গ্রামের লোকেরা এই মহিলাকে নানাভাবে নামকরণ করে থাকে। যেমন কলেরার ক্ষেত্রে যাকে দেখা যায় তার নাম ওলাবিবি। গুটিবসন্তের সময় যাকে দেখা যায় তার নাম শীতলা। গ্রামের বৃদ্ধদের কাছে এখনো দুই নাম বেশ পরিচিত। ষাটের দশকে প্রকাশিত হাজার বছর ধরে উপন্যাসেও দেখা যায় লেখক জহির রায়হান মহামারীর সাথে ওলাবিবির কথা উল্লেখ করছেন। এক্ষেত্রে তিনি যে লোকজ বিশ্বাস থেকেই উপাদান সংগ্রহ করেছেন তা অনুমেয়।
প্রশ্ন হল শীতলা ও ওলাবিবির নামকরণ কোথেকে। দুটি নামই এসেছে হিন্দু ধর্মবিশ্বাস থেকে। হিন্দু লৌকিক বিশ্বাস মতে ওলাবিবি ছয় বোন। রোগব্যাধি নিয়েই তাদের কাজকারবার। কলেরা মহামারী তাদের হাত ধরেই হয়। এজন্য মহামারী চলাকালে তাদের পূজা করা জরুরি। মেজর সি এইচ বাকের লেখা থেকে জানা যায়, শীতলাও হিন্দু বিশ্বাসমতে একজন দেবী। তার দায়িত্ব গুটিবসন্ত ছড়ানো। শীতলা শুধু বাংলাদেশেই নয় উত্তর ভারতেও পরিচিত নাম। ভারতের নানা অঞ্চলে গড়ে উঠেছে শীতলার মন্দির। (Faiths , Fairs, And Festivals Of India , 74)
কিন্তু হিন্দু লোকজ বিশ্বাসের সাথে রয়েছে আমাদের আকিদার বিরোধ। ফলে ওলাবিবি বা শীতলা কিছুতেই আমাদের বিশ্বাস নেই। তাহলে যারা মহামারী চলাকালে কোনো মহিলা বা অন্যকিছুর দেখার দাবি করছেন তাদের বিষয়টি কী হবে? এক্ষেত্রে সেসব মহিলা বা অন্যকিছুকে জ্বিন ধরে নিলে ব্যাখ্যা করা সহজ হয়ে যায়। জ্বিনকে দেখার বিষয়টি একাধিক হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। যদিও ইমাম শাফেয়ী, ইবনু হাযম আন্দালুসিসহ আলেমদের অনেকে মনে করেন নবীরা ব্যাতিত আর কেউ জ্বিনদের দেখতে পারে না। কিন্তু ইবনু হাজার আসকালানিসহ আলেমদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের মতে জ্বীনকে দেখা সম্ভব। তাদের মতে জ্বীনরা যখন তাদের মূল আকৃতিতে থাকে তখন নবী ব্যতিত অন্য কেউ তাদের দেখা সম্ভব নয়। কিন্তু যখন তারা অন্য কোনো আকৃতি ধারণ করে তখন সাধারণ মানুষের পক্ষেও তাদের দেখা সম্ভব। (ফাতহুল বারি, ইবনু হাজার আসকালানি, ৪/৪৮৯। ফাতহুল বারি, ইবনু রজব হাম্বলি, ৯/৩৩৪)
ফলে যারা মহামারী চলাকালে মহিলা দেখেছেন বলে দাবী করেছেন তারা জ্বিন দেখলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কথা হলো মহামারীর সাথে জ্বিনের কোনো সম্পর্ক আছে কিনা। বেশকিছু হাদিস থেকে মহামারীর সাথে জিনের সম্পৃক্ততার কথা জানা যায়। হাদিসগুলোর মধ্যে যইফ হাদিস যেমন আছে সহিহ হাদিসও আছে। সালাফদের মধ্যে যারা মহামারী সংক্রান্ত বই লিখেছেন তারা এসব হাদিস উল্লেখ করেছেন। এ প্রসংগে একটি হাদিসে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
فناءُ أمتِي بالطعنِ والطاعونِ قالوا يا رسولَ اللهِ هذا الطعنُ قد عرفناه فما الطاعونُ قال وخزُ إخوانِكم من الجنِّ ( و في رواية: وخز أعدائكم من الجن،) وفي كلٍّ شهادةٌ.
আমার উম্মত (কারো কারো মতে সাহাবীদেরকে বলা হচ্ছে) ছুরিকাঘাত (ও যখমের ব্যাথায়) এবং প্লেগ রোগে মারা যাবে। সাহাবীরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল আমরা তো ছুরিকাঘাত সম্পর্কে জানি কিন্তু এই প্লেগ রোগ কি? তিনি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের ভাই (অন্য রেওয়ায়াতে তোমাদের শত্রু) জিনদের খোঁচা। উভয় অবস্থাতেই শহীদী মর্যাদা পাবে।
(মুসনাদে আহমাদ, ১৯৫২৮। মুসনাদে তয়ালিসী, ৫৩৬। মুসনাদে বাযযার, ২৯৮৬। সনদ সহীহ)
মহামারী চলাকালে জ্বীন দেখার ঘটনাও নতুন নয়। মামলুক যুগের একজন প্রশাসক শরিফ শিহাবুদ্দিন আদনান নিজের অভিজ্ঞতার কথা এভাবে বলেছেন, একবার কায়রোতে মহামারী দেখা গেল। আমি একজন রোগী দেখতে বের হলাম। পথে শুনলাম কেউ কাউকে বলছে, তাকে আক্রান্ত কর। অপরজন বললো, না তাকে করা দরকার নেই। তার মাধ্যমে মানুষের উপকার হতে পারে। অপর কণ্ঠ বললো, তাহলে তার ঘোড়ার চোখকে আক্রান্ত কর। আমি আশপাশে তাকালাম কিন্তু কাউকে দেখা গেল না। রোগী দেখে ফিরে এসে দেখি আমার ঘোড়া দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে যদিও তার চোখে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। (বাজলুল মাউন ফি ফাজলিত তাউন, ১৫৩)
১৩৭৪ সালে দামেশকে সংঘঠিত একটি মহামারীর আলোচনা করতে গিয়ে ইবনু হাজার আসকালানি লিখেছেন, এ সময় একজন ব্যক্তি দেখে ঘোড়ায় আরোহণ করে অনেক জ্বিন যাচ্ছে। তাদের সবার হাতে বর্শা। ওই ব্যক্তি তাদেরকে বর্শা দিয়ে আঘাত করতে চাইলে তারাও তাকে আঘাত করে। পরদিন সে লোকজনকে এ বিষয়ে জানালে তাদের কেউ কেউ তার কথা অবিশ্বাস করে আবার কেউ তার কথা মেনে নেয়। কিন্তু কয়েকদিন পরেই তার শরিরে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায় এবং সে মারা যায়। (ইনবাউল গুমার বি আবনাইল উমার, ১/৭৭)
সম্ভবত ঐতিহাসিক বিবরণ এক্ষেত্রে আমাদেরকে একটি উপসংহারে পৌছতে সাহায্য করবে।

অন্যান্য লেখা

বইয়ের ক্যাটালগ ডাউনলোড করুন