ওয়াররাকদের বিচিত্র জীবন

ইবনে নাদীম, বিস্ময়কর আল ফিহরিস্ত বইয়ের লেখক, যার পুরো নাম আবুল ফারাজ মোহাম্মদ বিন ইসহাক আন নাদীম, তিনি ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ ওয়াররাক। আমাদের পরিচিত আরো অনেকেইওয়াররাক ছিলেন। বিখ্যাত বুজুর্গ মালেক ইবনে দীনারের কথাই ধরা যাক। ১৩১ হিজরীতে মৃত্যুবরনকারী এই মনিষীও ওয়াররাক ছিলেন। ইয়াকুত হামাভী, হিজরী ষষ্ঠ শতাব্দীর বিখ্যাত মুসলিম ভূগোলবিদ, যিনি মুজামুল বুলদানের লেখক, তিনিও ছিলেন ওয়াররাক। ওয়াররাকদের নামের তালিকা অনেক দীর্ঘ। সে তালিকায় যাওয়ার আগে জেনে নেয়া যাক , ওয়াররাকদের পরিচয় ।

ইবনে খালদুন ওয়াররাকদের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে , ‘বইয়ের অনুলিপি প্রস্তুত করা, প্রুফ দেখা, বাধাই করা এবং বই সংক্রান্ত যাবতীয় কিছু ওয়াররাকদের কাজের আওতায় পড়ে’ । আল্লামা সামআনি অবশ্য সংজ্ঞাটা আরো পরিস্কার করেছেন, ‘ ওয়াররাকরা কুরআনুল কারীম, হাদীস ও অন্যান্য বইপত্র লেখার কাজ করে। এছাড়া যারা কাগজ বিক্রী করে তাদেরকেও ওয়াররাক বলা হয়।’

ওয়াররাক (وراق) শব্দের অর্থ কাগজবিক্রেতা, বইবিক্রেতা, নকল-নবিস ইত্যাদী। শুধু এটুকুতেই ওয়াররাকদের পুরো পরিচয় উঠে আসে না । ওয়াররাকরা বই বাধাই করতেন, অনুলিপি প্রস্তুত করতেন , প্রচ্ছদে ছবি একে দিতেন, পান্ডুলিপি সংশোধনও করতেন। ইবনে খালদুন যেমনটা বলেছেন, এক সময় ইরাক ও আন্দালুসে ওয়াররাকদের প্রাচুর্য ছিল। হিজরী তৃতীয় শতাব্দীতে বাগদাদেই ওয়াররাকদের একশো দোকান ছিল। তাইতো আবুল মোতাহহার আযদী গর্ব করে ইস্ফাহানের লোকদের বলেছিলেন, বাগদাদে আমি যে পরিমান ওয়াররাক দেখেছি তোমাদের এখানে সে পরিমান নেই। ওয়াররাকদের দোকানে পাওয়া যেত লেখার উপকরণ, কাগজ, কলম ও বিভিন্ন শাস্ত্রের দুষ্প্রাপ্য বই। ওয়াররাকদের দোকানের প্রতি তাই জ্ঞানপিপাসুদের ছিল অন্যরকম আকর্ষণ। ওয়াররাকদের দোকানে ভিড় জমাতেন কবি, সাহিত্যিক ও আলেমরা। মুতাযিলী সাহিত্যিক জাহেয (মৃত্যু ২৫৫ হিজরী/৮৬৯ খ্রিস্টাব্দ) টাকার বিনিময়ে ওয়াররাকদের দোকানে রাত কাটাতেন। ওয়াররাকদের দোকানে ঘুরতেন মুতানাব্বিও (মৃত্যু ৩৫৫ হিজরী/৯৬৫ খ্রিস্টাব্দ)। আবুল ফারজ ইস্ফাহানিও (মৃত্যু ৪৫৬ হিজরী/৯৬৭ খ্রিস্টাব্দ) ওয়াররাকদের দোকান থেকেই কেনাকাটা করতেন।

শুধু বাগদাদ কিংবা আন্দালুস নয়, ওয়াররাকদের এমন দোকান গড়ে উঠেছিল পুরো মুসলিম বিশ্বজুড়ে। রাহা শহরে ছিল সাদ ওয়াররাকের দোকান। বইয়ের লোভে সেখানে ছুটে আসতেন জ্ঞানীগুনিরা। ঐতিহাসিক মাকরেজি লিখেছেন , কায়রোতে ওয়ারাকদের প্রচুর দোকান ছিল। সেদিনের মুসলিমবিশ্বে ওয়াররাকদের তাই প্রাচুর্য। তাদের দোকানে জন্ম নিচ্ছিল নতুন নতুন হস্তলিপি। দুষ্প্রাপ্য পান্ডুলিপির সন্ধান মিলছে তাদের কাছে। প্রথমদিকে ওয়াররাকরা কাগজ, কলম ও অন্যান্য লেখার উপকরণ বিক্রি করতেন। ধীরে ধীরে তারা অনুলিপি প্রস্তুত শুরু করেন। এবং এক সময় পান্ডুলিপি সংশোধন, প্রুফ দেখা এসব কাজেও দক্ষতা অর্জন করেন। এসময় তারা বিভিন্ন শাস্ত্রের বইপত্র নিয়ে ঘাটাঘাটি করেন এবং প্রচুর অনুলিপি প্রস্তুত করেন। প্রথম যুগের ওয়াররাকদের মধ্যে আমরা পাই খালেদ বিন আবি হাইয়াজের নাম। তিনি ছিলেন তার সুন্দর হস্তলিপির জন্য বিখ্যাত। তিনি উমাইয়া খলীফা ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালেকের দরবারের ফরমান ও ঘটনাবলী লিপিবদ্ধ করতেন। ইবনে নাদীম লিখেছেন, খালেদ বিন আবি হাইয়াজ খলীফা উমর বিন আব্দুল আজিজের জন্য কোরআনের একটি অনুলিপি প্রস্তুত করেছিলেন। প্রথম যুগের আরেকজন বিখ্যাত ওয়াররাক হলেন মালেক ইবনে দীনার (মৃত্যু ১৩১ হিজরী / ৭৪৮ খ্রিস্টাব্দ)। তিনি অনুলিপি প্রস্তুত করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।খলীফা হারুনুর রশীদের সময়ে এমন দুজন বিখ্যাত ওয়াররাক ছিলেন, খাশনাম বসরী ও মাহদী আল কুফী। ইবনে নাদীমের সময় বিখ্যাত ওয়াররাকদের মধ্যে ইবনে উম্মে শায়বান, মাসহুর, আবুল ফারাজ প্রমুখ প্রসিদ্ধ ছিলেন। ওয়াররাকদের কেউ কেউ বইয়ের মলাটে স্বর্ণের প্রলেপ লাগাতেন। ইবরাহিম সগির, আবু মুসা বিন আম্মার, ইবনুস সাকতি, আবু আবদুল্লাহ খুজাইমি প্রমুখ এই কাজে দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। ওয়াররাকদের স্বর্ণযুগ ছিল আব্বাসী খেলাফতের সময়কালে। কারণ ততোদিনে কাগজের ব্যবহার বেড়েছে। খলীফা হারুনুর রশীদ চামড়ায় সরকারী ফরমান লেখার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন এবং সকল লেখালেখি কাগজে করার নির্দেশ দেন। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন শহরে স্থাপিত হয় কাগজের কল। গ্রীক দর্শন ও সাহিত্যের বইপত্র অনুবাদ হচ্ছে আরবি ভাষায়। ফলে ওয়ারাকদের চাহিদাও বাড়ছে।

ওয়ারাকদের কাজ ছিল কয়েক ধরনের ।

১। তারা বই, কাগজ, কলম ইত্যাদী বিক্রি করতেন।
২। লেখকরা তাদের বই পাঠাতেন ওয়ারাকদের কাছে। ওয়াররাকরা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে অনুলিপি প্রস্তুত করে দিতো। এক্ষেত্রে লেখকরা খোজ করতেন সুন্দর হস্তলিপির ওয়াররাক। ইবনে নাদিম লিখেছেন, আবু মুসা হামেদ ছিলেন সুন্দর হস্তাক্ষর ও লিখনশৈলীর জন্য বিখ্যাত। মোহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ কিরামি ছিলেন বহু ভাষাবিদ। তার হাতের লেখাও খুব সুন্দর ছিল। ইয়াকুত হামাভী এমন অনেকের নাম উল্লেখ করেছেন যারা সুন্দর হাতের লেখার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। এমনই একজন আহমদ বিন মোহাম্মদ কারশি। আবুল হাসান আলি বিন আহমদ বিন আবু দুজানা মিসরীও হাতের লেখার জন্য বিখ্যাত ছিলেন, তবে তার প্রায়ই বানান ভুল হতো। ইবনে খাল্লিকান মুগ্ধ হয়েছেন আবু মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহর হাতের লেখা দেখে। কর্ডোভায় বিখ্যাত ছিলেন আহমাদ বিন মোহাম্মদ বিন হাসান । মাগরিবে বিখ্যাত ছিলেন আব্বাস বিন ওমর সকলি।
৩। কখনো কখনো ওয়ারাকরা উপস্থিত হতেন আলেমদের ইমলার মজলিসে। এসকল মজলিসে আলেমরা বিভিন্ন বিষয়ের দরস দিতেন। অনেকেই এগুলো লিপিবদ্ধ করতো। ওয়াররাকরাও লিখতো। পরে এইসব দরস বই আকারে সনকলন করা হত। এগুলোকে বলা হত আমালি। হাজি খলীফা কাশফুজ জুনুনে এমন অনেক আমালির কথা উল্লেখ করেছেন । আমালি ইবনু হাজেব, আমালি ইবনে হাজার আসকালানি, আমালি ইবনে দুরাইদ, আমালি আবু জাফর বখতারী এই বইগুলো এ ধরনের মজলিসেই লেখা হয়।
৪। অনেক কুতুবখানা ও আলেমদের গৃহে ওয়ারাকদের নিয়োগ দেয়া হত। তারা সেখানে থেকে অনুলিপি প্রস্তুত, প্রুফ সংশোধন ইত্যাদী কাজ করতেন। তারিখে বাগদাদের ভাষ্যমতে ইয়াকুব বিন শাইবা সাদুসী (মৃত্যু ২৬২ হিজরী/৮৭৫ খ্রিস্টাব্দ) যখন তার মুসনাদ লেখার কাজ শুরু করেন তখন তার গৃহে চল্লিশটি তোষক ছিল ওয়াররাকদের রাত্রী যাপনের জন্য।
৫। সাধারণ পাঠকরা এসে ওয়ারাকদের নির্দিষ্ট কোনো বই অনুলিপি করে দিতে বলত। ওয়াররাকরা সেটি করে দিতো।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ননা থেকে ওয়ররাকদের পারিশ্রমিক সম্পর্কে অনুমান করা যায়। যদিও এই ধারনা সার্বজনিন নয়, কিংবা সব অঞ্চলের ওয়াররাকদের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্যও নয়, তবু একটা মোটামুটি ধারনা হয়। হিজরী তৃতীয় শতকের শুরুর দিকে ওয়াররাকরা দশ পৃষ্ঠার অনুলিপির বিনিময় নিতেন ১ দিরহাম। এই সময়ে ফাররা খলীফা মামুনের বেশ কিছু কাজ করেছেন এই বিনিময়ে। এই শতকের মাঝামাঝি ওয়াররাকদের পারিশ্রমিক বৃদ্ধি পায়। ৫ পৃষ্ঠার বিনিময় হয় ১ দিরহাম। এ সময় মোহাম্মদ বিন ইয়াযিদ বিন দিনার ১০০ পৃষ্ঠা লেখার বিনিময়ে আবু উবাইদুল্লাহ ইয়াযিদীর কাছ থেকে ২০ দিরহাম গ্রহন করেছেন। এই শতকের শেষ দিকে আবারও মূল্য বেড়ে যায়। ৫ পৃষ্ঠার বিনিময় তখন ৩ দিরহাম। এই সময়ের একজন বিখ্যাত ওয়াররাক আবু মোহাম্মদ উবাইদুল্লাহ সম্পর্কে খতীব বাগদাদী লিখেছেন , তিনি ৫ পৃষ্ঠার বিনিময়ে ২ দিনার তথা ৩ দিরহাম গ্রহণ করতেন।হিজরী চতুর্থ শতাব্দির শেষদিকে আবারো মূল্য বেড়ে যায়। এ সময় ওয়াররাকরা ১ পৃষ্ঠার বিনিময়ে ১ দিরহাম গ্রহণ করতেন। কাজী আবু সাইদ সিরাজী (মৃত্যু ৩৬৮ হিজরী/৯৭৮ খ্রিস্টাব্দ) ১০ পৃষ্ঠার বিনিময়ে ১০ দিরহাম নিয়েছেন। ফাররা এবং সিরাজীর সময়কালের পার্থক্য ১৬১ বছর। এই সময়ে ওয়ারাকদের মুজুরি বেড়েছে ১০ বার। ওয়াররাকদের পেশা ছিল সম্মানের পেশা। আলেম উলামা ও কবি সাহিত্যিকদের অনেকেই তাই এই পেশায় খুজতেন হালাল রিজিক। আবু উবাইদ আলি বিন হুসাইন বিন হারব বাগদাদী ছিলেন শাফেয়ি মাজহাবের ফকিহ। তিনি মিসরের কাজী ছিলেন। পেশাগত দায়িত্বের বাইরে তিনি ছিলেন একজন ওয়াররাক। এইম পেশা থেকে তার মাসিক উপার্জন ছিল ১২০ দিনার। আবুল আব্বাস মোহাম্মদ বিন মোহাম্মদ বিন ইয়াকুব উমাভী ছিলেন খোরাসানের বিখ্যাত আলেম। তিনি হাদীস বর্ননা করে অর্থ গ্রহণ করা অপছন্দ করতেন তাই পেশা হিসেবে বিরাক্বাহ বেছে নেন।

আবু জাকারিয়া ইয়াহইয়া বিনা আদি হিজরি চতুর্থ শতাব্দির একজন খ্যাতনামা দার্শনিক। তিনি নিজের হাতে তাফসিরে তাবারীর দুটি অনুলিপি প্রস্তুত করে বাজারে বিক্রয় করেন। কেউ কেউ আর্থিক সংকটের কারনেও এই পেশায় আসতেন। মোহাম্মদ বিন সোলাইমান বিন তুর্কমান শাহের পিতা অনেক সম্পদ রেখে যান। তিনি আমোদ উল্লাসে সম্পদ উড়িয়ে দেন। পরে বাধ্য হয়ে এই পেশায় আসেন। খতিব বাগদাদী লিখেছেন সিবরী বিন আহমদ বিন মসুলির কথা। তিনিও আর্থিক অনটনে পড়ে নিজের কবিতার বই ওয়াররাকদের বাজারে বিক্রি করে দেন। তাজউদ্দিন আলি বিন আহমদ হুসাইনি ছিলেন ইস্কান্দরিয়ার প্রখ্যাত ওয়াররাক। একসময় আর্থিক সামর্থ্য বৃদ্ধি পেলে তিনি এই পেশা ছেড়ে দেন।

ওয়াররাকরা দিনে কী পরিমান লিখতেন তা স্পষ্ট করে বলা যায় না। ব্যক্তি ভেদে তাদের লেখার গতিও ভিন্ন হতো। তবে আবু জাকারিয়া ইয়াহইয়া বিনা আদী ও ইবনে শিহাব আকবরির জীবনি থেকে জানা যায় তারা প্রতিদিন গড়ে ১০০ পৃষ্ঠা লিখতেন , অনুলিপি করতেন। ওয়াররাকদের পেশা ছিল সম্মানের । তবে কেউ কেউ ওয়াররাকদের নিন্দাও করেছেন । যেমন জনৈক কবি লিখেছেন

أما الوراقة فهي أنكد حرفة – أوراقها وثمارها الحرمان
شبهت صاحبها بصاحب إبرة – تكسو العراة وجسمها عريان

( বখিল এবং কৃপণ পেশা কাগজ-কলম-গ্রন্থনা
যেথায় শুধু অপূর্ণতা, পাতায়-পাতায় বঞ্চনা
সুঁইয়ের ছোঁয়ায় বস্ত্র-বুনট, তবু যে তার শূন্যতা
লেখক এবং সুঁইয়ের মাঝে কোথায় বলো ভিন্নতা ?) (কাব্যানুবাদ- মাহমুদ সিদ্দিকী)

বাগদাদে ওয়াররাকদের দুটি বাজার ছিল। একটি নগরীর পশ্চিম প্রান্তে, কারখ অঞ্চলে। এই বাজারের বিবরণ প্রথম পাওয়া যায় ইয়াকুত হামাভির লেখায়। তিনি হিজরী তৃতীয় শতাব্দীতে এই বাজার পরিভ্রমণ করেন। তখন সেখানে ওয়াররাকদের ১০০ দোকান ছিল। কারখের এই বাজার প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৫৭ হিজরীতে। ওয়াররাকদের অন্য বাজারটি ছিল নগরীর পূর্ব প্রান্তে, রসাফাহ অঞ্চলে। ইবনুল জাওযি (মৃত্যু ৫৯৭ হিজরী) কারখের বাজারের কথা উল্লেখ না করলেও এই বাজারের কথা উল্লেখ করেছেন। তার বিবরণ থেকে জানা যায়, এখানে নিয়মিত উলামাদের এবং কবিদের মজলিস বসতো। ইয়াকুত হামাভী লিখেছেন আবুল গানায়েম হাবশি বিন মোহাম্মদ টানা বিশ বছর প্রতি রাতে ওয়াররাকদের বাজারে এসব মজলিসে উপস্থিত হতেন। সমকালীন জনজীবনে এইসব মজলিসের সামাজিক , সাংস্কৃতিক প্রভাব অপরিসীম। কেমন কর্মব্যস্ত ছিল এই বাজারদুটি। ইয়াকুত হামাভীর বর্ননা থেকে আমরা কিছুটা অনুমান করতে পারি। কারখের বাজারেই ছিল ওয়াররাকদের একশোটি দোকান। এখানে বই কেনাবেচা হতো। ওয়াররাকদের এসব দোকানে লেখালেখির যাবতীয় উপকরণ পাওয়া যেতো। আলেম উলামাদের ভীড় লেগেই থাকতো। তারা তাদের প্রয়োজনীয় বইপত্রের অনুলিপি প্রস্তুত করাতেন দক্ষ ওয়াররাকদের হাতে। কারখের ওয়াররাকের জানার পরিধি অনেক বিস্তৃত। তাকে বাগদাদের বাইরের খোজখবরও রাখতে হতো। মরক্কো, মিসর কিংবা আন্দালুসে নতুন কোন বইটি প্রকাশিত হলো সে বিষয়ে থাকতো তার স্বচ্ছ ধারনা। ওয়াররাকদের দোকানে তাই মিলতো নতুন বইয়ের খবরাখবর। জাহেজ কারখের বাজারেই রাত কাটাতেন। এসব বাজারে বসতো বিতর্কেও মজলিস। সেকালে ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশে এইসব বাজারের ভুমিকা ছিল অনন্য। মুহাল্লাব বিন আবু সফরা তার ছেলে যে অসিয়ত করেছেন তা থেকে বিষয়টি বুঝা যায়। তিনি সন্তানদের বলেছিলেন, তোমরা কখনো বাজারে সময় কাটাবে না । তবে বর্মনির্মাতা ও ওয়াররাকদের পাশে বসতো পারো’। ওয়াররাকরা প্রায়ই নিলামদার নিয়োগ দিতেন। এই নিলামদারের কাজ হতো বাজারের মোড়ে কিংবা অপেক্ষাকৃত উচু স্থানে দাঁড়িয়ে বইয়ের নিলাম করা। প্রথমে সে উচ্চকন্ঠে বই এবং লেখকের নাম বলতো। বলতো বইয়ের পৃষ্ঠাসংখ্যা। বইয়ের গুরুত্বপূর্ন কিছু লাইন পড়ে শোনাতো। তারপর আগ্রহী ক্রেতাদের মধ্যে নিলাম শুরু হতো।

আবুল ফারাজ ইস্ফাহানির কিতাবুল আগানি চার হাজার দিরহামে নিলামে বিক্রি করা হয়। এইসব নিলামদাররা অনেক দক্ষ হতো। বিভিন্ন শাস্ত্রের বইপত্র সম্পর্কে তাদের থাকত অগাধ জ্ঞান। ইবনে সীনা একবার ওয়াররাকদের বাজারে অবস্থান করছিলেন। সেখানে তখন আবু নসর ফারাবির বইয়ের নিলাম চলছিল। নিলামদার ইবনে সীনাকে জোরাজুরি করছিল বইটি কেনার জন্য । ইবনে সীনা অনাগ্রহ প্রকাশ করলেন। নিলামদার বললো, এটি খুবই মূল্যবান বই কিন্তু দাম কম। তার চাপাচাপিতে ইবনে সীনা ৩ দিরহামে বইটি ক্রয় করে বাসায় নিয়ে যান। পরে ইবনে সীনা বলেছিলেন, ‘এই বইটি আমার সামনে এক নতুন জগত উম্মোচন করেছে’। কেউ মারা গেলে নিলামদাররা মৃত ব্যক্তির বাড়িতে গিয়ে বইপত্র কিনে আনতো। সাআলাবের ইন্তেকালের পর খাইরান ওয়াররাক তার কুতুবখানা ৩০০ দিনারে ক্রয় করে। আসআদ বিন মাতরানের ইন্তেকালের পর তার বইপত্র তিন হাজার দিরহামে ক্রয় করা হয়। এভাবে ওয়াররাকরা অনেক দুষ্প্রাপ্য বই সংগ্রহ করতো। কোনো বই বেশি ভালো লাগলে তারা সেটি নিজের সংগ্রহে রেখে দিত। বিক্রি করতো না। ইয়াকুত হামাভী লিখেছেন আবু সাইদ উমর বিন আহমদ দিনাওয়ারির কথা। তার কাছে তবারির ادب النفوس الجيدة و الاخلاق النفيسة বইটি ছিল। এটি প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠার বই, যা ইমলার মজলিসে লেখা হয়। আবু সাইদ উমর এটি বিক্রি করেন নি। তিনি এটি নিজের সাথে শামে নিয়ে যান এবং এ বই থেকে উপকৃত হন। ওয়াররাকদের বাজারে নানা ধরনের প্রতারণা ও ছলছাতুরিও হতো। ইবনে খশাব (মৃত্যু ৫৬৭ হিজরী/১১৭১ খ্রিস্টাব্দ) বাজারে গেলে ওয়াররাকদের অমনযোগিতার সুযোগে বইয়ের পৃষ্ঠা ছিড়ে ফেলতেন। তারপর বলতেন বইটি তো ত্রুটিপূর্ণ। এই বলে বইটি কমদামে কিনতেন। কখনো কখনো ওয়াররাকদের উপর নিষেধাজ্ঞা আসতো। ইবনুল আসির ২৭৯ হিজরীর (৮৯২ খ্রিস্টাব্দ) ঘটনাবলীতে লিখেছেন এ বছর ওয়াররাকদের নিষেধ করা হয় দর্শন ও ইলমুল কালামের বইপত্র বিক্রি করতে। ইবনুল জাওযি লিখেছেন মনসুর হাল্লাজকে হত্যার পর তার বইপত্র বিক্রয় করতে নিষেধ করা হয়।ওয়াররাকদের মধ্যে আলেম উলামা কবি সাহিত্যিক যেমন ছিলেন তেমনি মদ্যপ ও লম্পট চরিত্রের লোকও ছিল।

বকর বিন খারেজা আল কুফি তার উপার্জনের পুরোটাই মদপান করে উড়িয়ে দিতো। উমর বিন আব্দুল মালেক তো মদের গুনাগুন বর্ননা করে অনেক কবিতাই লিখে ফেলে। ইবনে রশিক বলেন, আমি আবু বকর আতিবা বিন মোহাম্মদ তাইমিকে দেখলাম মসজিদের মিম্বওে বসে বয়ান করছে। বয়ানের ফাকে ফাকে সে কান্না করছিল। সেরাতে আমি তার গৃহে গেলাম। দেখি সে তাম্বুরা নিয়ে বসে আছে, পাশে এক সুদর্শন গোলাম। আমি বললাম, আফসোস । তোমার দিনের চরিত আর রাতের চরিত্রে কী আকাশ পাতাল তফাত। সে বললো, ওটা ছিল আল্লাহর ঘর আর এটা আমার ঘর। আমি যেখানে থাকি সেখানের নিয়ম মেনে চলি । মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মতো ভারতবর্ষের প্রতিটি শহর ও গ্রামে ওয়াররাকদের বসবাস ছিল। তাদের কর্মের ধরন মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য শহরে বসবাসকারী ওয়াররাকদের চেয়ে ভিন্ন কিছু ছিল না। কারখের বাজারে বসা ওয়াররাকের সাথে বিলগ্রামের ওয়াররাকদের কাজের মিল ছিল অনেকাংশেই। আল্লামা আব্দুল হাই ফিরিঙ্গি মহল্লী ওয়াররাকদের যে সংজ্ঞা দিয়েছেন তা থেকেই বিষয়টি পরিস্কার হয়। তার ভাষ্যমতে, ওয়াররাক তাদেরকে বলা হয় যারা কুরআনুল কারীম, হাদীস এবং অন্যান্য বইপত্রের অনুলিপি প্রস্তুত করে। এছাড়া কাগজ বিক্রেতাদেরকেও ওয়াররাক বলা হয়। ভারতবর্ষে ওয়াররাকদের নুসসাখও বলা হতো। ফাওয়ায়েদুল ফুয়াদে নিজামুদ্দিন আউলিয়া এমনই এক ওয়াররাকের কথা বলেছেন। শায়খ ফরিদউদ্দীন গঞ্জে শকরের ভাই শায়খ নাজিবুদ্দীন মুতাওয়াক্কিলের ‘জামিউল হেকায়াত’ বইটি প্রয়োজন ছিল। আর্থিক অসামথ্যের কারনে তিনি বইটির অনুলিপি প্রস্তুত করতে পারছিলেন না। একদিন হামিদ ওয়াররাক তার দরবারে এলে তাকে নিজের ইচ্ছার কথা জানালেন। হামিদ ওয়াররাক জিজ্ঞাসা করলো ‘আপনার কাছে এখন কতো আছে?’। ‘এক দিরহাম’ বললেন শায়খ নাজিবুদ্দীন। হামিদ ওয়াররাক সেই এক দিরহাম গ্রহণ করে কাগজ কিনে আনলো এবং জামেউল হেকায়াতের অনুলিপি লেখার কাজ শুরু করে দিলো।

ভারতবর্ষে ওয়াররাকদের পরিমাণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারনা পাওয়া যায় মোল্লা আব্দুল কাদের বাদায়ুনীর লেখায়। বিখ্যাত কবি উরফী সিরাজীর জীবন আলোচনা করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘এমন কোনো বাজার ছিল না যেখানে বই বিক্রেতারা উরফি ও সানাইর দিওয়ান বিক্রি করতো না । ভারতবর্ষে ওয়াররাকদের প্রাচুর্যের পক্ষে আরেকটি শক্ত দলীল স্বয়ং মোল্লা আব্দুল কাদের বাদায়ুনীর লেখা ‘মুন্তাখাবুত তাওয়ারিখ’ বইটি, যা তারীখে বাদায়ুনী নামেও পরিচিত। বইটি তিনি লেখেন আকবরের শাসনামলে। বইয়ের কিছু অংশ আকবরকে ক্ষিপ্ত করতে পারে এই আশংকায় তিনি বইটি প্রকাশ না করে লুকিয়ে রাখেন। তার মৃত্যুর পর বইটি কোনো এক ওয়াররাকের হাতে পৌছায়। তিনি বেশ কিছু কপি তৈরী করে ফেলেন। দ্রুতই বইটি ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন এলাকায়। তখন জাহাংগীরের শাসনামল। বইটি পাঠ করে তিনিও ক্ষিপ্ত হন। মোল্লা সাহেবের পরিবারকে রাজদরবারে ডেকে ভৎসনা করা হয়। তাদের থেকে মুচলেকা নেয়া হয়, তারা আর এই বই প্রকাশ করবে না। জাহাঙ্গীর নিজে বইটি বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেন। তবুও বইটি বাজার থেকে সরানো সম্ভব হলো না। শহর নগর এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলেও তখন প্রচুর ওয়াররাকদের বসবাস। তারা দ্রুতই বইটির প্রচুর অনুলিপি প্রস্তুত করে ফেলছিল, যা নিয়ন্ত্রণ করতে মুঘল সম্রাটও ব্যর্থ হয়েছেন। অলিগলিতে তখন ওয়াররাকদের দোকান। যে কোনো বই তারা কপি করে ফেলছেন স্বল্পসময়ে। পেশাদার ওয়াররাক নন, এমন ব্যক্তিরাও তখন ঈর্ষনীয় দক্ষতার অধিকারী হতেন। বিলগ্রামের একজন আলেম শাহ তৈয়বের জীবনিতে মাওলানা গোলাম আলী আজাদ বিলগ্রামী লিখেছেন, ‘তিনি ১৫ দিনে শরহে জামীর একটি অনুলিপি লিখেছিলেন’ যারা শরহে জামী কিতাবের আকৃতি সম্পর্কে জানেন তারা বুঝতে পারবেন, এতো অল্পসময়ে এই কাজ করতে কী পরিমান দক্ষতা প্রয়োজন। এছাড়াও শাহ তৈয়ব আরো অনেক কিতাবের অনুলিপি প্রস্তুত করেছেন। যার মধ্যে আছে ইয়াহইয়া বিন আবু বকর আমেরি আল ইয়ামানির লেখা বিখ্যাত সীরাত গ্রন্থ বাহজাতুল মাহাফিল। এটি তিনি তেইশ দিনে লিখেছেন।

মাওলানা আজাদ বিলগ্রামী লিখেছেন, শাহ তৈয়বের বেশ বড়সড় একটি কুতুবখানা ছিল। যেখানে শুধু তার নিজের হাতে অনুলিপি করা বইগুলো ছিল। শাহ তৈয়ব কোনো পেশাদার ওয়াররাক ছিলেন না। জীবিকার প্রয়োজনে তিনি অন্যান্য কাজ করতেন। দরস-তাদরীসে সময় দিতেন। তবুও তার এ পরিমান দক্ষতা ছিল যে নিজের অনুলিপি করা বই দিয়েই একটা বড়সড় কুতুবখানা হয়ে যায়। শায়খ কামাল নামে আরেকজন আলেম নাহু, সরফ, মানতেক, দর্শন ও ফিকহের বিভিন্ন বইপত্রের অনুলিপি প্রস্তুত করতেন এবং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হাশিয়া বা পার্শ্বটীকা লিখে দিতেন। সেকালের বেশিরভাগ আলেমই বইপত্রের অনুলিপি প্রস্তুতে দক্ষতা রাখতেন। আবুল ফজলের পিতা মোল্লা মোবারক নাগোরী নিজের হাতে বড় বড় ৫০০ টি বইয়ের অনুলিপি প্রস্তুত করেন। শায়খ জুনাইদ হিসারী র. সম্পর্কে আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী আখবারুল আখইয়ারে লিখেছেন, তিনি মাত্র তিন দিনে পুরো কোরআনুল কারীম এরাবসহ (যবর, যের, পেশ) লিখে ফেলতেন।

ওয়াররাকদের সেই দিন আর নেই। প্রযুক্তির অগ্রসরতার সাথে সাথে হারিয়ে গেছে ওয়াররাকরা। তবে এখনো দেওবন্দ কিংবা হাটহাজারীর সংকীর্ণ কুঠুরিতে বসে বই বাধাইয়ে মগ্ন বৃদ্ধগন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন ওয়ারাকদের সোনালী যুগের কথা।

তথ্যসূত্র

১। আল কিতাব ফিল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা — ড ইয়াহইয়া ওহিব জুবুরি
২। মাওসুআতুল ওয়াররাকাহ ওয়াল ওয়াররাকিন — ড খাইরুল্লাহ সাদ
৩। আল খত্ব ওয়াল কিতাবাহ ফিল হাদারাতিল আরাবিয়্যা– ড ইয়াহইয়া ওহিব জুবুরি
৪। ওয়াররাকু বাগদাদ ফিল আসরিল আব্বাসি –ড খাইরুল্লাহ সাদ
৫। হিন্দুস্তান মে মুসলমানো কা নেজামে তালিম ও তরবিয়ত– মানাযির আহসান গিলানী
৬। আখবারুল আখইয়ার– আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী

অন্যান্য লেখা

বইয়ের ক্যাটালগ ডাউনলোড করুন