পূর্বসূরী

পূর্বসূরী (১৩-২৫)

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr
১৩। এক অচেনা বীরের গল্প
তার জন্মসাল সম্পর্কে ইতিহাস নীরব। জানা যায়নি কোথায় এবং কবে তার জন্ম। তিনি কোনো গোত্রপতি ছিলেন না। ছিলেন না সম্ভ্রান্ত পরিবারের কোনো আদুরে দুলাল। এতদূর জানা যায়, তার বাল্যকাল কেটেছে শহরের ফটকে ভিক্ষা করে। কিছুদিন লোকদের পানি পান করিয়ে উপার্জন করেন। পরে যোগ দেন সেনাবাহিনীতে।
তাকে প্রথম দেখা যায়, ৭০১ খ্রিস্টাব্দে। আবদুর রহমান বিন মোহাম্মদ বিন আশআসের বিরুদ্ধে লড়ছেন হাজ্জাজ বিন ইউসুফের পক্ষ হয়ে। তার সাহসিকতা ও রণদক্ষতার প্রশংসা করেছেন তাবারী। পরের বছরগুলিতে তিনি হারিয়ে গেছেন ইতিহাসের পাতা থেকে। আবার তার দেখা মেলে ৭১৮ খ্রিস্টাব্দে। এবার লড়ছেন শাওজাব খারেজির বিরুদ্ধে।
আবার তিন বছর বিরতী। ৭২১ খ্রিস্টাব্দ। উমর বিন হুবাইরা তাকে সুগদের* যুদ্ধে প্রেরণ করেন। তিনি এসে এক তেজোদীপ্ত ভাষণ দিয়ে সেনাবাহিনীকে চাঙ্গা করেন। বিজয় ছিনিয়ে আনেন। ৭২২ খ্রিস্টাব্দে তিনি যাইহুন নদী অতিক্রম করে দাবুসিয়া শহর দখল করেন। ৭৩০ খ্রিস্টাব্দ। আরমেনিয়ার একাংশের প্রশাসক জাররাহ বিন আবদুল্লাহ আল হাকামি খুন হলেন। খলিফা হিশাম বিন আবদুল মালিক তাকে প্রেরণ করলেন আরমেনিয়ায়। তিনি ঝড়ের বেগে এসে উপস্থিত হন আরযান শহরে। জাররাহের বন্ধুদের সাথে মিলিত হন। দায়িত্ব বুঝে নেন। আরমেনিয়ার অন্যান্য এলাকা বিজয় করেন।
তিনি ছিলেন একজন যোগ্য সেনাপতি। সতর্ক, কুশলী। উঠে এসেছিলেন ভিক্ষুকের পেশা থেকে। কিন্তু একাগ্রতা তাকে উঠিয়েছে অনন্য উচ্চতায়।
তার নাম সাইদ বিন আমর আল হারাশি। তার জন্মতারিখ যেমন জানা যায় না, মৃত্যু তারিখও তেমনই অজ্ঞাত।
*সমরকন্দ ও বুখারার মধ্যবর্তী একটি এলাকা।
(সূত্র– কদাতুল ফাতহিল ইসলামি ফি ইরমিনিয়া– মাহমুদ শীত খাত্তাব)
—-
আবু মুহাম্মদ ইবনু ইয়াজ। আন্দালুসের যোদ্ধা। তার সাহসিকতার খ্যাতি ছিল গোটা আন্দালুস জুড়ে। জীবন কাটিয়েছেন আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে। হাফেজ যাহাবীর মতে তিনি ৫৬৮ হিজরী পর্যন্ত বেচে ছিলেন। আবদুল ওয়াহেদ বিন আলি মারাকেশি বলেন, তিনি ছিলেন নেককারদের অন্তর্ভুক্ত। মুনাজাতে বসলে দ্রুতই তার চোখে অশ্রু জমা হতো। তিনি যখন ঘোড়ায় আরোহন করতেন তখন তার সামনে দাড়ানোর সাহস হতো না কারো। খ্রিস্টানদের চোখে তিনি ছিলেন একাই একশো যোদ্ধার সমতূল্য।
আবু মুহাম্মদ ইবনু ইয়াজ নিজের ঘটনা শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, সেবার আমরা ফরাসিদের বিরুদ্ধে লড়ছিলাম। তারা ছিল প্রায় দুলাখ যোদ্ধা। এর মধ্যে অশ্বারোহী ছিল এক লাখ। তারা যখন আমাদের দিকে তীর নিক্ষেপ করে তখন মনে হচ্ছিল পংগপালের ঝাক এগিয়ে আসছে। বৃষ্টির মতো তীর নিক্ষেপ করে তারা। এমনকি তীরের ঝাকের আড়ালে সূর্যও হারিয়ে যায়। এই তীরবৃষ্টির মধ্যেও আমরা দুইশ যোদ্ধা এগিয়ে যাই। ফরাসিদের রক্ষনব্যুহ ভেদ করে আমরা ভেতরে প্রবেশ করি। তীব্র লড়াই হয়। পরে আমরা যাইতুনা দুর্গে আশ্রয় নেই।
মাসউদ বিন ইযযিন নাস বলেন, রোমিয়দের সাথে যুদ্ধ চলছিল। আবু মুহাম্মদ ইবনু ইয়াজ এক রোমান সেনাকে জোরে ধাক্কা দিলে সে পড়ে যায়। তার আর্তনাদ শুনে মনে হচ্ছিল তার হাড়গোড় চূর্ণ হয়ে গেছে। আবু মুহাম্মদ ইবনু ইয়াজ তার কোমর ধরে তাকে শূন্যে তুলে ফেলেন। তার আংগুলের ফাকে রক্ত দেখা যায়। ইবনু ইয়াজ রোমান সেনাকে আছাড় মারেন। সেনাটির মাথা ফেটে যায়।
আরেকবারের ঘটনা। এক রোমান সেনা ইবনু ইয়াজকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে লড়ার আহবান জানালো। ইবনু ইয়াজ এগিয়ে গেলেন। তার পরিহিত জামার হাতা ছিল লম্বা। হাতার ভেতর পাথর লুকানো ছিল। হাতার মুখ বন্ধ ছিল। কোমরে ঝুলছিল তরবারী। ইবনু ইয়াজ সৈন্যটির কাছাকাছি হতেই তার মুখে সজোরে হাত দিয়ে আঘাত করেন। সৈন্যটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। আবু মুহাম্মদ ইবনে ইয়াজ জীবনের শেষ যুদ্ধে লড়ছিলেন রোমানদের বিরুদ্ধে। প্রায় ৫০০ রোমান সেনাকে তিনি তার বাহিনী নিয়ে আক্রমন করেন। লড়াইয়ের এক ফাকে পেছন থেকে একটি তীর এসে তার পিঠে বিদ্ধ হয়। তিনি সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে লড়াই অব্যাহত রাখেন। এ যুদ্ধে রোমানরা পরাজিত হয়। তার পিঠ থেকে তীর খোলার চেষ্টা করা হয় কিন্তু তীর তার মেরুদন্ডের হাড়ে বিধেছিল। এই আঘাতেই তার মৃত্যু হয়।
যতদিন বেচে ছিলেন সাহসিকতার সাথেই বেচে ছিলেন।
(সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২০শ খন্ড, ২৩৭ পৃষ্ঠা– হাফেজ শামসুদ্দিন যাহাবী)
১৪। আমি ছোট পাগড়ি পরেই নামাজ পড়েছি
কনস্টান্টিনোপল। শহরের বিচারক শায়খ ইউসুফ বিন হুসাইন নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে বের হলেন। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে উযির ইবরাহিম পাশার দূত।
‘শায়খ, উযির আপনাকে ডেকেছেন’ ‘চলো’ এই বলে রওনা হলেন শায়খ।
তার মাথায় বাঁধা ছোট একটি পাগড়ি। সেকালে উসমানিয়দের রীতি ছিল সুলতান বা উযিরের দরবারে উপস্থিত হতে হলে লম্বা পাগড়ি পরিধান করতে হবে। ছোট পাগড়ি পরিধান করা দোষ বলে গন্য হতো।
উযির ইবরাহিম পাশা শায়খকে দেখেই ক্রোধান্বিত হলেন।
‘আপনি দরবারের আদব জানেন না ? ছোট পাগড়ি পরেছেন কেন?’
‘আমি এই ছোট পাগড়ি পরেই নামাজ পড়েছি। এরপর শুনলাম আপনি আমাকে ডেকেছেন। যে পাগড়ি পরে নামাজ পড়েছি, আল্লাহর সামনে দাড়িয়েছি তা বদলে লম্বা পাগড়ি পরা আমার কাছে বেয়াদবি মনে হয়েছে। আল্লাহর দরবারের চেয়ে কোনো মানুষের দরবারকে বেশি সম্মান দিতে আমার ঈমানী গায়রত বাধা দিয়েছে’ শান্তকন্ঠে বললেন ইউসুফ বিন হুসাইন।
উযির ইবরাহিম পাশা শায়খের কথায় খুবই প্রভাবিত হন। পরে সুলতান বায়েযিদের কাছেও এ ঘটনা উল্লেখ করেন।
(আশ শাকাইকুন নুমানিয়া ফি উলামাইদ দাওলাতিল উসমানিয়া, ১২৮ পৃষ্ঠা– তাশ কুবরাযাদা। দারুল কুতুবিল আরাবিয়্যা, বৈরুত)
১৫। হাসান বসরীর দৃঢ়তা
হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ। প্রসিদ্ধ তাবেয়ী। তিনি ছিলেন তার যুগে আলেমদের সর্দার। তিনি হাদিস বর্ননা করেছেন ইমরান বিন হুসাইন, মুগিরা ইবনে শোবা, সামুরা বিন জুনদুব ও নুমান বিন বশির থেকে। বসবাস করতেন বসরায়। দলে দলে মানুষ ভিড় জমাতো তার মজলিসে। হাসান বসরি ও রাবেয়া বসরিকে নিয়ে অনেক কিচ্ছা-কাহিনী প্রচলিত আছে। বাস্তবে এসবের কোনো ভিত্তি নেই। হাসান বসরি ইন্তেকাল করেছেন ১১০ হিজরীতে।(১) পক্ষান্তরে রাবেয়া বসরির জন্মই ১০০ হিজরীতে। (২) — হাজ্জাজ বিন ইউসুফ যখন ইরাকের প্রশাসক নিযুক্ত হলেন তখন তার বিরুদ্ধে যারা সোচ্চার ছিলেন হাসান বসরী তাদের অন্যতম। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ওয়াসিত শহরে একটি অট্টালিকা নির্মান করেন। শহরবাসীকে সেখানে নিমন্ত্রন করা হয়। হাসান বসরিও উপস্থিত হন। তিনি বলেন, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। রাজণ্যরা নিজেদের সম্মানিত মনে করে। আর আমরা প্রতিনিয়ত তাদের কাজ থেকে শিক্ষা নেই। হে হাজ্জাজ, এই প্রাসাদ তোমার কী উপকারে আসবে? যমিনের বাসিন্দারা তোমাকে ঘৃণা করে। আসমানের বাসিন্দারা তোমাকে অভিসম্পাত করে। তুমি অস্থায়ী ঘর নির্মানে ব্যস্ত অথচ ভুলে গেছ স্থায়ী আবাসের কথা। প্রশংসা আল্লাহর। তিনি আলেমদের থেকে অংগীকার নিয়েছেন তারা যেন স্পষ্ট ভাষায় হক প্রকাশ করে এবং সত্য গোপন না করে।
এই বলে চলে এলেন। (৩) — ১০৩ হিজরী। খলিফা ইয়াযিদ বিন আবদুল মালিক ইরাক ও খোরাসানের গভর্নর নিয়োগ দিলেন উমর বিন হুবাইরা আল ফাযারিকে। খলিফা বিভিন্ন সময় উমর বিন হুবাইরার কাছে এমন কিছু নির্দেশ পাঠাতেন যা ছিল সুস্পষ্ট অন্যায়। উমর বিন হুবাইরা ডেকে পাঠালেন মুহাম্মদ ইবনে সিরীন, ইমাম শাআবি ও হাসান বসরিকে।
‘আমিরুল মুমেনিন ইয়াযিদ বিন আব্দুল মালিককে আল্লাহ আমাদের খলিফা বানিয়েছেন। আমাদের উপর আবশ্যক হলো তার আনুগত্য করা। আমিরুল মুমেনিনের আদেশ পালনের ব্যাপারে আপনারা কী বলেন?’ উমর বিন হুবাইরা প্রশ্ন করলেন। ইমাম শাআবি এমন জবাব দিলেন যা ছিল খলিফা ও গভর্নরের প্রতি পক্ষপাতমূলক।
‘হাসান, আপনি কিছু বলুন’ বললেন গভর্নর। ‘শাআবি তো বলেছেনই’ জবাব দিলেন হাসান বসরি।
‘আপনার কথাও শুনতে চাই’
‘তাহলে শুনে রাখো, শীঘ্রই আল্লাহ তোমার কাছে একজন ফেরেশতা পাঠাবেন। সে ফেরেশতা তোমাকে তোমার এই আলিশান অট্টালিকা থেকে বের করে কবরের সংকীর্ণতা ও অন্ধকারে নিয়ে যাবে। সেখানে তোমার নিজের আমল ছাড়া আর কিছুই কাজে আসবে না। মনে রেখো, আল্লাহ তোমাকে দুনিয়া ও আখিরাতের সকল অনিষ্ট থেকে বাচাতে সক্ষম। কিন্তু খলিফা তোমাকে আল্লাহর আজাব ও গজব থেকে বাচাতে পারবে না। সুতরাং তুমি খলিফার আদেশ মানার সময় আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহর আদেশ মানতে গিয়ে খলিফাকে ভয় করো না’। (৪)
তথ্যসূত্র:
১। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া (১৩শ খন্ড, ৫৪ পৃষ্ঠা)- — হাফেজ ইমাদুদ্দিন ইবনে কাসীর। মারকাযুল বুহুস ওয়াদ দিরাসাতিল আরাবিয়্যা ওয়াল ইসলামিয়্যা। ২। সিয়ারু আলামিন নুবালা (৮ম খন্ড, ২৪১ পৃষ্ঠা)— হাফেজ শামসুদ্দিন যাহাবী। মুআসসাসাতুর রিসালাহ। ৩। আদাবুল হাসান আল বসরি ওয়া যুহদুহু ওয়া মাওয়াইউজুহু, ১০৭ পৃষ্ঠা– ইবনুল জাওযি। দারুন নাওয়াদের। দামেশক। ৪। ওফায়াতুল আইয়ান (২য় খন্ড, ৭১ পৃষ্ঠা)– আল্লামা ইবনে খাল্লিকান। দার সাদের, বৈরুত।
১৬। হাজিব আল মানসুর
হাজিব আল মানসুর। আন্দালুসে আমিরিয়া সাম্রাজ্যের (৩৬৬-৩৯৯ হিজরী/৯৭৬-১০০৯) অধিপতি। পুরো নাম মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ বিন আমের। প্রথম জীবনে তিনি কেরানী পদে কাজ করতেন। পরে ৩৫৬ হিজরীতে শাহজাদা আবদুর রহমানের গৃহশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। খলীফা হাকাম আল মুসতানসিরের মৃত্যুর পর আন্দালুসের আকাশে দেখা দেয় দুর্যোগের ঘনঘটা। উত্তরের খৃস্টান রাজ্যগুলো পূর্বের সকল চুক্তি ভঙ্গ করে। তারা নিয়মিত মুসলমানদের এলাকায় হামলা চালিয়ে লুটপাট করতে থাকে। এদিকে এগারো বছর বয়সী খলিফা হিশাম ইবনুল হাকাম প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হন। এই অস্থির পরিস্থিতিতে উত্থান ঘটে মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ বিন আমেরের। পরে যিনি হাজিব মানসুর উপাধি ধারণ করেন। তিনি শাসনক্ষমতা করায়ত্ত করেন। লাগাতার যুদ্ধে খৃস্টান রাজ্যগুলোকে পরাজিত করেন। প্রশাসনের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।
হাজিব মানসুরের সাথে নাফার রাষ্ট্রের চুক্তি ছিল, তারা নিয়মিত হাজিব মানসুরকে জিযিয়া দিবে এবং কখনো কোনো মুসলমানকে বন্দী করবে না। একবার হাজিব মানসুর তার দূত পাঠালেন নাফার রাষ্ট্রে। সেখানকার প্রশাসন এই দূতের খুব যত্নআত্তি করে। তাকে রাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকা ঘুরিয়ে দেখানো হয়। একদিন দূত এক গির্জায় তিনজন মুসলমান নারীকে দেখে অবাক হয়। সে প্রশ্ন করে, তোমরা এখানে কেন? নারীরা জানায় তাদেরকে বন্দী করে রাখা হয়েছে।
দূত ফিরে এসে হাজিব মানসুরকে একথা জানাতেই তিনি ক্রোধান্বিত হন। এক বিশাল মুসলিম বাহিনী প্রেরণ করেন নাফার রাষ্ট্র অভিমুখে। খ্রিস্টানরা মুসলিম বাহিনী দেখে অবাক হয়।
‘আপনাদের সাথে তো আমাদের চুক্তি হয়েছে। আমরা আপনাদের জিযিয়া দিব। বিনিময়ে আপনারা আমাদের সাথে লড়াই করবেন না। তাহলে এই বাহিনী নিয়ে এলেন কেন?’ তারা বলে।
‘তোমরা আমাদের তিন নারীকে বন্দী করে রেখেছো। আমরা তাদের উদ্ধার করতে এসেছি’ মুসলিম সেনাপতি জবাব দেন।
খৃস্টান নৃপতি জানায় তারা কোনো মুলমানকে বন্দী করেনি। পরে মুসলিম দূত সেই গির্জায় গিয়ে তিন নারীকে বের করে আনে। খ্রিস্টান নৃপতি বারবার ক্ষমা চায়। সে বলে, এটা জনৈক সৈন্যের কাজ। দ্রুতই তাকে শাস্তি দেয়া হবে। আমরা এ বিষয়ে কিছুই জানতাম না।
খ্রিস্টান নৃপতি হাজিব মানসুরের কাছেও পত্র লিখে ক্ষমা চায়। সে জানায়, আমরা দোষীকে শাস্তি দিয়েছি এবং গির্জাটিও ভেংগে ফেলেছি।
হাজিব মানসুরের বাহিনী তিন মুসলিম নারীকে নিয়ে বিজয়ীর বেশে কর্ডোভায় ফিরে আসে।
তথ্যসূত্র:
১।নাফহুত তিব মিন গুসনিল আন্দালুসির রাতিব (১ম খন্ড, ৪০৪ পৃষ্ঠা)– আহমাদ বিন মোহাম্মদ আল মাক্কারি। দার সাদের, বৈরুত। মাক্কারির বর্ননায় একজন মহিলার কথা আছে। ২।আল বায়ানুল মুগরিব ফি ইখতিসারি আখবারী মুলুকিল উন্দলুস ওয়াল মাগরিব — আহমাদ বিন মুহাম্মদ মারাকেশী। দারুল গরবিল ইসলামি, তিউনিসিয়া।
১৭। এক আলেমের আত্মমর্যাদা
কাবিচা বিন উকবা রহিমাহুল্লাহ। ইমাম বুখারী ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল তার থেকে হাদিস বর্ননা করেছেন। ২১৫ হিজরীতে তিনি ইন্তেকাল করেন। — একবার শাহজাদা দালিফ বিন আবু দালিফ খাদেমসহ তার সাথে দেখা করতে আসলেন। খাদেমরা ঘরের দরজায় করাঘাত করলো। সম্ভবত শায়খ কোনো কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তাই বের হতে দেরী করছিলেন। একজন খাদেম অতিউৎসাহি হয়ে বললো, শায়খ, আপনি দেরী করছেন কেন? মালিকুল জাবালের (পাহাড়ের বাদশাহ) ছেলে এসেছে আপনার সাথে দেখা করতে। তিনি আপনার কাছ থেকে হাদিস শুনবেন। একথা শুনে শায়খ বের হলেন। শায়খের কাপড়ে শুকনো রুটির টুকরো লেগেছিল। শায়খ রুটির টুকরোর দিকে ইশারা করে বললেন,
‘যে ব্যক্তি দুনিয়ার উপর এতেই সন্তুষ্ট হয়ে আছে, তার কাছে পাহাড়ের শাহজাদার কী কাজ? তার সাথে আমি কোনো কথাই বলবো না’
একথা বলে শায়খ ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলেন।
(সিয়ারু আলামিন নুবালা , ১০ম খন্ড, ১৩৪ পৃষ্ঠা– হাফেজ শামসুদ্দিন যাহাবী। মুআসসাসাতুর রিসালাহ)
১৮। আমি কখনোই তোমাকে আদিল বলবো না
সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক। শাসনকাল ১৩২৫-১৩৫১ খ্রিস্টাব্দ। ভারতবর্ষের এক বিস্ময়কর শাসক। জ্ঞানেগুনে, সাহসিকতা ও বিচক্ষনতায়, বুদ্ধিমত্তা ও মেধার প্রখরতায়, ন্যায়বিচার ও শাসনদক্ষতায়, উচ্চ মনোবল ও একগুয়ে মানসিকতায়, যে দৃষ্টিকোন থেকেই দেখা হোক, সুলতান ছিলেন এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী শাসক। শিহাবুদ্দিন দিমাশকির বর্ননামতে, সুলতান কোরআনের হাফেজ ছিলেন। এছাড়া হানাফী ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হেদায়াও তার মুখস্থ ছিল।(১) সুলতানের চিন্তাধারা ছিল তার যুগ থেকে অনেক এগিয়ে। ফলে জনসাধারণ প্রায়ই তার বিভিন্ন সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা বুঝতে ব্যার্থ হত। আবার সুলতানের তাড়াহুড়া ও একগুয়ে মানসিকতাও তাকে জনসাধারণ থেকে দূরে সরিয়ে দিত। প্রফেসর খলিক আহমদ নিজামির ভাষায়, তার মেজাজের কারনে পরিস্থিতি খারাপ হলো, আবার পরিস্থিতির কারনেও তার মেজাজ বিগড়ে গেল। (২) তার মুল্যায়ন করতে গিয়ে ঐতিহাসিকরাও তাই বিপাকে পড়েছেন। সুলতানী আমলের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারনী কখনো তাকে নিযামুল মুলক কিংবা আহমদ হাসানের সাথে তুলনা করেছেন আবার কখনো ইয়াজিদ কিংবা হাজ্জাজ বিন ইউসুফের সাথে তুলনা করেছেন।(৩) — সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক ডেকে পাঠিয়েছেন মাওলানা শিহাবুদ্দিন হককে। শায়খ শিহাবুদ্দিন হক পৌছলেন সুলতানের দরবারে।
‘এখন থেকে আমাকে মুহাম্মদ আদিল (ন্যায়বিচারক) বলবেন’ সুলতান আদেশ দিলেন।
‘কখনোই নয়। আমি আপনাকে জালিম মনে করি’ শান্তকন্ঠে বললেন শায়খ শিহাবুদ্দিন হক।
‘আদিল বলতেই হবে। নইলে প্রহরীদের আদেশ দিব আপনাকে কেল্লার দেয়াল থেকে ফেলে হত্যা করতে’
‘আমি কখনোই তোমাকে আদিল বলে স্বীকৃতি দিব না’ শায়খ তার কথায় অনড়।
সুলতানের আদেশে শায়খকে কেল্লার দেয়াল থেকে ফেলে হত্যা করা হয়। পরে কেল্লার পাশেই তাকে কবর দেয়া হয়। (৪)
তথ্যসূত্র —————- ১। মাসালিকুল আবসার ফি মামালিকিল আমসার, ৩য় খন্ড, ৫৮ পৃষ্ঠা। ২। সালাতিনে দিহলি কি মাজহাবি রুজহানাত, ৩২৪ পৃষ্ঠা। ৩। তারীখে ফিরোজশাহী। ৪। আখবারুল আখইয়ার, ১৪6 পৃষ্ঠা– শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী।
১৯। আমাদের মায়েরা
ইমাম সুফইয়ান ইবনু উয়াইনাহ রহিমাহুল্লাহ। বিখ্যাত মুহাদ্দিস। জন্ম ১০৭ হিজরীতে, ইন্তেকাল ১৯৮ হিজরীতে। তার সম্পর্কে ইমাম শাফেয়ী রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, হেজাজে যদি ইমাম মালিক ও সুফইয়ান ইবনে উয়াইনাহ না থাকতেন তাহলে হেজাজ থেকে ইলম বিদায় নিতো। দশ বছর বয়সেই তিনি হাদীস শেখার জন্য বিভিন্ন অঞ্চল সফর শুরু করেন।(১) — সুফইয়ান ইবনে উয়াইনাহ হাদিসের অন্বেষণে সফর শুরু করলে তার আম্মা তাকে বলেছিলেন, বেটা, তুমি মন দিয়ে হাদিস পড়তে থাকো। আমি সুতার চরকা কেটে উপার্জন করবো, তোমার দেখভাল করবো। তুমি দশটি হাদিস শোনার পর নিজের দিকে তাকাবে। দেখবে তোমার চালচলন ও আচার আচরণে কোনো পরিবর্তন এসেছে কিনা। যদি না আসে তাহলে বুঝবে অর্জিত ইলম তোমার কোনো উপকারে আসেনি। (২)
#
ইমাম আউযায়ী রহিমাহুল্লাহ। শামের বিখ্যাত আলেম। ১৫৭ হিজরীতে তিনি ইন্তেকাল করেন*। হালকাপাতলা গড়নের এই মানুষটি ছিলেন তার যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম। আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহিমাহুল্লাহ বলতেন, যদি আমাকে বলা হয় এই উম্মাহর জন্য দুজন আলেম বেছে নিতে, তাহলে আমি ইমাম আউযায়ী ও সুফিয়ান সাওরিকে বেছে নিবো। — ইমাম আউযায়ী জন্মেছেন বালাবাক্কা শহরে। বাল্যকালেই পিতাকে হারান। প্রতিপালিত হয়েছেন মায়ের আদরে। মায়ের কাছেই তার শিক্ষাজীবনের শুরু। ওলিদ বিন মাজিদ বলেন, ইমাম আউযায়ীর আম্মা তাকে যে আদব ও শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়েছিলেন, রাজা বাদশাহরাও তাদের সন্তানকে এমন শিষ্টাচার শিক্ষা দিতে অপারগ ছিল। (৩) — তথ্যসূত্র ১। সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৮ম খন্ড, ৪৫৪ পৃষ্ঠা– হাফেজ শামসুদ্দিন যাহাবী। ২। তারীখে জুরজান, ৪৯২ পৃষ্ঠা– হামজা ইবনে ইউসুফ আস সাহমি। ৩। তাজকিরাতুল হুফফাজ, ১ম খন্ড, ১৩৪ পৃষ্ঠা– হাফেজ শামসুদ্দিন যাহাবী।
* *আল বিদায়া ওয়ান নিহায়াতে ইবনে কাসীর রহিমাহুল্লাহ ১৫৭ হিজরী লিখেছেন। তবে সিয়ারু আলামিন নুবালাতে ইমাম যাহাবী লিখেছেন, আলি ইবনুল মাদিনীর মতে তার ইন্তেকাল ১৫১ হিজরীতে।
ইমাম মালেক রহিমাহুল্লাহ। মালেকি মাজহাবের ইমাম। তিনি নিজের শিক্ষাজীবনের শুরুর দিকের গল্প শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি আম্মাকে বললাম, আমি ইলম শিখতে চাই। আম্মা বললেন, আসো, আমি তোমাকে আলেমদের পোষাক পরিয়ে দিচ্ছি। এই বলে আম্মা আমার মাথায় একটি কালো টুপি পরিয়ে দিলেন, পাগড়ি বেধে দিলেন। তারপর বললেন, যাও, রবিয়া আর রায় এর মজলিসে বসো। আগে তার কাছ থেকে আদব শিখো, এরপর ইলম। — ইমাম মালেকের মায়ের নাম আলিয়া বিনতে শরিক বিন আবদুর রহমান। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ মহিলা।
# শোবা ইবনুল হাজ্জাজ। সুফইয়ান সাওরি তাকে আমিরুল মুমেনিন ফিল হাদিস বলেছেন। ইমাম শাফেয়ী রহিমাহুল্লাহ বলেন, যদি শোবা ইবনুল হাজ্জাজ না থাকতেন তাহলে ইরাক থেকে ইলমে হাদিস বিদায় নিতো। আবু দাউদ তয়ালিসি বলেন, আমি শোবা ইবনুল হাজ্জাজ থেকে সাত হাজার হাদিস শ্রবণ করেছি। আইয়ুব সখতিয়ানি ও সুফইয়ান সাওরির মতো মুহাদ্দিসরা তার থেকে হাদিস শ্রবন করেছেন। — শোবা ইবনুল হাজ্জাজকে তার আম্মা হাদিস শ্রবনে তাগাদা দিতেন। একবার তিনি বলেন, বা্বা, শহরের এক মহিলা হজরত আয়েশা (রা) থেকে হাদিস বর্ননা করছেন। তার কাছে যাও। হাদিস লিখে আনো। শোবা ইবনুল হাজ্জাজ মায়ের কথা মতো সেই মহিলার গৃহে হাদিস শ্রবন করতে যান।
# মুহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল আওকাস। মক্কার কাজি ছিলেন। চেহারা ছিল শ্রীহীন। গলার আকৃতি ছোট ছিল, মনে হতো কাধের উপর ধড় বসানো। তার আম্মা তাকে বলেন, বেটা, তোমার চেহারার যে অবস্থা তুমি যেখানেই যাবে মানুষ তোমাকে অবজ্ঞা করবে। তোমার উচিত ইলম অর্জনে মনোযোগী হওয়া। ইলম তোমাকে সম্মান এনে দিবে। মানুষের মধ্যে অনন্য করে তুলবে। মুহাম্মদ আল আওকাস মায়ের আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন। তার অর্জিত ইলম তাকে অনন্য সম্মান এনে দিয়েছিল। তিনি প্রায় ২০ বছর মক্কা শরীফের কাজির দায়িত্ব পালন করেন।
# আবু হাফস উমর বিন হারুন বলখী। খোরাসানের বিখ্যাত মুহাদ্দিস। মায়ের কাছেই পড়াশোনার হাতেখড়ি। এমনকি তার আম্মা তাকে হাদিস লেখায় সাহায্য করতেন।
(খাওয়াতিনে ইসলাম কি দিনি ও ইলমি খিদমাত– কাজী আতহার মোবারকপুরী)
২০। রাজমহলের নন্দিনী
ব্যাপারটা এতদূর গড়াবে কে জানতো।
সামান্য একটা বিষয় নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথা কাটাকাটি হচ্ছিল। তর্কের একপর্যায়ে স্বামীর কন্ঠ চড়তে থাকে। স্ত্রীকে ধমক দিয়ে বসেন। স্বামীর এ আচরণ স্ত্রীর কাছে ছিল অপ্রত্যাশিত। তার দুচোখ অশ্রুতে টলমল করে উঠে। দৌড়ে নিজের মহলে ছুটে আসেন তিনি। হতভম্ব স্বামী স্ত্রীর পিছু নেন। স্ত্রী মহলে পৌছে দরজা আটকে দেন। স্বামী বেচারা দাঁড়িয়ে থাকেন দরজার ওপাশে। স্বামী অনুনয় বিনয় করেন, মাফ চান, বারবার বলেন দরজা খুলতে কিন্তু স্ত্রী কোনো জবাব দেন না।
স্বামী আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান, ৫ম উমাইয়া খলিফা, ইবনে খালদুন যার প্রশংসায় পঞ্চমুখ, তিনি দরজার বাইরে অপেক্ষা করতে থাকেন। সময় গড়ায়, স্ত্রী দরজা আটকে বসে থাকেন। খলিফা আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ানের কাছে প্রতিটি মুহুর্ত্য অসহ্য মনে হয়। দ্রুত নিজের কক্ষে এসে ডেকে পাঠান উমর বিন বেলাল আসাদিকে। উমর বিন বেলাল আসাদি বনু উমাইয়ার নেতৃস্থানীয়দের একজন। হজরত মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু ও ইয়াযিদ বিন মুয়াবিয়ার দরবারেও তাকে সমীহ করা হতো। উমর বিন বেলাল আসাদি খলিফার ডাক পেয়ে ছুটে এলেন।
‘আমার স্ত্রী আমার উপর অভিমান করেছে। সে নিজের মহলে ঢুকে দরজা আটকে দিয়েছে। আমি অনেক বলেছি, সে কিছুতেই দরজা খুলছে না’ বললেন খলিফা।
‘অভিমান তো। একটু পরেই কেটে যাবে। আপনি পেরেশান হবেন না’ বললেন উমর বিন বেলাল আসাদি।
‘নাহ, তাকে ছাড়া প্রতিটি মুহূর্ত অসহ্য মনে হচ্ছে। আমি আর থাকতে পারছি না। আপনি যেভাবে পারেন তাকে বুঝান’ অনুনয়ের স্বরে বললেন খলিফা। মুসলিম বিশ্বের প্রতাপশালী এই খলিফার এমন চেহারা আগে দেখেনি কেউ।
‘আচ্ছা আমি দেখছি কী করা যায়’ এই বলে উঠে এলেন উমর বিন বেলাল আসাদি। — উমর বিন বেলাল আসাদি এলেন রানীর মহলের সামনে। দরজার সামনে বসে তিনি কান্না শুরু করলেন। রানী দাসীদের পাঠালেন খবর জানতে। দাসীরা এসে উমর বিন বেলাল আসাদিকে দেখে চমকে গেল। যে মানুষটিকে বনু উমাইয়ার ছোট-বড় নির্বিশেষে সবাই শ্রদ্ধা করে তিনি কান্না করছেন।
‘আপনি কান্না করছেন কেন?’ দাসীরা প্রশ্ন করে।
‘আমার দুই ছেলে। আজ তাদের একজন অপরজনকে হত্যা করে। আমি খলিফাকে বললাম, আমি যেহেতু নিহত ব্যক্তির অভিভাবক তাই আমি খুনীকে মাফ করে দিলাম। খলিফা আমার কথা মানতে নারাজ। তিনি বলেন, খুনীকেও হত্যা করা হবে। যেন তা অন্য খুনীদের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে।
আমি তা হতে দিতে পারি না। আমি চাইনা আমার দুই ছেলেই নিহত হোক। তোমরা যাও, রানীকে একটু বলো আমার কথা। শুধু তিনিই পারেন খলীফাকে বোঝাতে। তিনি খলীফাকে একটু বোঝালেই আমার ছেলের জীবন রক্ষা পাবে’ কাদতে কাদতে বললেন উমর বিন বেলাল। — দাসিরা এসে রানীকে সব জানালো।
‘আমি এখন কী করবো? আমি তো রাগ করে খলীফার সাথে কথা বলা ছেড়ে দিয়েছি’ রানী অসহায় কন্ঠে বললেন।
‘সমস্যা নেই। খলিফা নিজেও আপনার সাথে কথা বলার জন্য অস্থির হয়ে আছেন। তিনি তো দরজার পাশে অনেকক্ষন অপেক্ষা করেছেন’ দাসীদের একজন বলে।
‘আমার যাওয়া উচিত। উমর বিন বেলালকে আমার বাবা ও দাদা খুব সম্মান করতেন। আমি চাইনা এই মানুষটা শেষ বয়সে এসে এতবড় আঘাত পাক’ এই বলে রানী নতুন কাপড় পরলেন, সুগন্ধী মাখলেন। দাসীদের বললেন, মহলের দরজা খুলে দাও। আমি খলীফার কক্ষে যাবো। — নিজের কক্ষে দাঁড়িয়ে আছেন আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান। রানী কক্ষে প্রবেশ করে সালাম দিলেন। খলীফা কোনো জবাব দিলেন না। তিনি তাকিয়ে আছেন অন্যদিকে। তার বুকেও জমে আছে চাপা অভিমান।
‘আমি নিজের জন্য আপনার কাছে আসিনি। এসেছি উমর বিন বেলালের পক্ষ হয়ে’ রানী বললেন।
‘বলো, শুনছি’ খলিফা নির্বিকার কন্ঠে বললেন।
‘আপনি তার ছেলেকে কতল করতে চান, অথচ তিনি নিজেই সেই ছেলেকে মাফ করে দিয়েছেন। আপনিও তাকে মাফ করে দিন’ রানী মৃদু কন্ঠে বললেন।
‘নাহ, আমি মাফ করবো না। আমি চাই এই ঘটনা সবার জন্য শিক্ষা হয়ে থাকুক। আর কেউ যেন কাউকে হত্যা করার সাহস না করে’ খলীফা দৃঢ় কন্ঠে বললেন। একবারও তিনি রানীর দিকে তাকাননি।
রানী এগিয়ে এসে খলীফার হাত ধরে ফেললেন। দুচোখে আকুলতা। খলীফা বাধ্য হলেন রানীর চোখে চোখ রাখতে।
‘আমার কথাটা রাখুন। আপনি জানেন আমার বাবা ও দাদার দরবারে উমর বিন বেলালকে কতটা সম্মান করা হতো। এই দিকটা ভেবে হলেও আপনি তার ছেলেকে মাফ করে দিন’ রানী কন্ঠের সবটুকু আকুলতা মিশিয়ে বললেন।
খলীফার ভেতরের অভিমানের বাধ হুড়মুড় করে ভেংগে গেল। চোখে জমা হলো দুফোটা অশ্রু।
‘শুনো, উমর বিন বেলালের কিচ্ছু হয়নি। আমি তাকে বলেছি যেভাবে পারে তোমাকে মহল থেকে বের করতে। তাই সে এই অভিনয় করেছে’ এই বলে খলীফা স্ত্রীকে কাছে টেনে নিলেন। দুজনে গল্প শুরু করলেন। ভুলে গেলেন আগের রাগ, অভিমান, সবকিছু।
# খলীফার প্রিয়তমা এই রানীর নাম আতিকা বিনতে ইয়াযিদ। যার সারাজীবন কেটেছে রাজপ্রাসাদে। তার আত্মীয়দের মধ্যে অন্তত বারোজন খলিফা হয়েছেন, যাদের সাথে তার পর্দা করা আবশ্যক ছিল না। দাদা মুয়াবিয়া বিন আবি সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন প্রথম উমাইয়া খলিফা। পিতা ইয়াযিদ বিন মুয়াবিয়া, বিতর্কিত এক খলিফা। ভাই মুয়াবিয়া বিন ইয়াযিদ, তিনিও খলিফা। স্বামী আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান, ৫ম উমাইয়া খলীফা। শ্বশুর মারওয়ান বিন হাকাম, তিনিও খলিফা।
আতিকা বিনতে ইয়াযিদের জন্ম সিরিয়ায়। সেখানেই বেড়ে উঠেন। পিতা তার জন্য পড়াশোনার ব্যবস্থা করেন। শীঘ্রই তিনি বিভিন্ন শাস্ত্রে দক্ষতা অর্জন করেন। বিশেষ করে হাদীসশাস্ত্রে তার পান্ডিত্য ছিল সর্বজনবিদিত। দানশীলতায় তিনি ছিলেন অতুলনীয়। নিজের সব সম্পদ আবু সুফিয়ানের পরিবারের গরিবদের দান করে দিয়েছিলেন। আতিকা বিনতে ইয়াযিদ ইন্তেকাল করেন দামেশকে, ১২৬ হিজরীতে (৭৪৪ খ্রিস্টাব্দ)। সেখানেই তাকে দাফন করা হয়।
(সূত্র: নিসাউন ফি কুসুরিল উমারা– আহমদ খলিল জুমআ)
——-
খলিফার প্রাসাদে আজই প্রথম আসা। লোকটির ভয় করছে। সে হেটে এসেছে দজলার পাড় দিয়ে। নদীতে ভাসছিল প্রমোদতরী ও ব্যবসায়ীদের নৌকা। ব্যবসায়ীদের নৌকাগুলো যাবে বসরা। অনেক আগে সে একবার বসরা গিয়েছিল। খেজুর বাগানের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নহরের দৃশ্য এখনো মনে গেথে আছে।
প্রাসাদে ঢুকতে কোনো সমস্যা হলো না। স্বয়ং রানী তাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। চাকররা তাকে একটি সাদা মহলে নিয়ে এল। ‘বসুন এখানে, একটু পর রানী পাশের কামরায় আসবেন’ এই বলে চাকর চলে গেল।
লোকটি বসে আছে। বাতাসে একটা অচেনা ফুলের সুবাস ভাসছে। মহলের ভেতর থেকে কুরআন তিলাওয়াতের শব্দ শোনা যায়। একটু পর ওপাশের পর্দাটা মৃদু নড়ে উঠে। লোকটি মৃদুস্বরে সালাম দেয়।
‘কেমন আছেন?’ ওপাশ থেকে মিষ্টি কন্ঠ ভেসে আসে।
‘ভালো আছি, আপনি কেমন আছেন?’ লোকটি সমীহের সুরে বলে। পর্দার ওপাশে আছেন আবু জাফর মানসুরের আদরের নাতনী, আব্বাসী সাম্রাজ্যের রানী।
‘ভালো। আপনার খবর বলুন’
‘কাজ এগোচ্ছে। ইতিমধ্যে ওয়াদি নোমান থেকে আরাফাত ময়দান পর্যন্ত নহর খনন করা হয়েছে। এখন আরেকটি শাখা হুনাইন থেকে মক্কা পর্যন্ত খনন করা হবে। সমস্যা হলো এই এলাকায় কয়েকটি পাহাড় আছে। পাহাড় কেটেই নহরের কাজ করতে হবে। এতে প্রচুর খরচ হবে’ লোকটি বলে।
‘আপনি কাজ করতে থাকুন। খরচ যা হয় আমি পাঠিয়ে দিব। যদি শ্রমিকদের হাতুড়ির প্রতিটি আঘাতের জন্য এক দিনার খরচ হয় তবুও পরোয়া করবেন না। কাজ চালিয়ে যাবেন’ রানী কন্ঠে দৃঢ়তা এনে বললেন।
‘আপনি ব্যাপারটা বুঝার চেষ্টা করছেন না। ইতিমধ্যে প্রায় ১০ লাখ দিনার খরচ হয়ে গেছে’ লোকটি মরিয়া হয়ে বললো।
‘শুনুন, আমি আর কোনো কথা শুনতে চাই না। আপনি কাজ চালিয়ে যান। আজ থেকে সব হিসাব বন্ধ। আমি এই হিসাব ত্যাগ করলাম, হিসাবের দিনের জন্য। হিসাবের দিন আমি আল্লাহকে এই হিসাব দিব’ রানী বললেন।
এই কথার পর আর কথা চলে না। লোকটি বিদায় নিল।
# এই ছিল নহরে যুবাইদা খননের সময়কার গল্প। হারুনুর রশিদ, আরব্য রজনীর রহস্যময় বাদশাহ, উজির জাফর বারমাকিকে নিয়ে যিনি রাতের আধারে ঘুরে বেড়াতেন বাগদাদ, তার স্ত্রী যুবাইদার আদেশে ও অর্থায়নে হাজিদের জন্য এই নহর খনন করা হয়। এই নহর খননের ফলে হাজিদের পানির কষ্ট অনেকটাই লাগব হয়। নহর খননে মোট ব্যয় হয় ১৭ লাখ দিনার।
# যুবাইদার আসল নাম আমাতুল আজিজ। বেড়ে উঠেছিলেন দাদা আবু জাফর মানসুরের প্রাসাদে। দাদা আদর করে তাকে ডাকতেন যুবাইদা নামে। পরে এই নামেই তিনি ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেন। ১৬৫ হিজরীতে হারুনুর রশীদের সাথে তার বিবাহ হয়। কসরুল খুলদ প্রাসাদে তাদের বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়। তার গর্ভে খলিফা আমিনের জন্ম হয়। বলা হয়, তিনিই একমাত্র আব্বাসী মহিলা যার গর্ভে কোনো খলিফা জন্ম নিয়েছেন।
# যুবাইদা ছিলেন অত্যন্ত দানশীল ও ইবাদতগুজার মহিলা। তার প্রাসাদে তিনি একশো হাফেজাকে রেখেছিলেন। এদের কাজ ছিল শুধু কুরআন তিলাওয়াত করা। একজনের পর একজন তিলাওয়াত করতে থাকতো। ২৪ ঘন্টাই তার প্রাসাদে তিলাওয়াতের শব্দ শোনা যেত। তিনি প্রচুর দান করতেন। খতীব বাগদাদী লিখেছেন, একবার হজ্বের সফরে, মাত্র ৬০ দিনে, যুবাইদা গরীব দুস্থ ও হাজিদের মধ্যে ৫ কোটি ৪০ লক্ষ দিনার দান করেন। যুবাইদা মক্কায় ৫টি হাউজ ও অনেক অযুখানা নির্মাণ করেন। খলীফা তার এই স্ত্রীকে খুবই ভালোবাসতেন।
# যুবাইদা ইন্তেকাল করেন ২১৬ হিজরীতে। তিনি আশা করেছিলেন, হিসাবের দিনে তিনি আল্লাহর কাছে হিসাব দিবেন। আমরা আশা করি, তার নিয়তের কারনে তার হিসাব সহজ হবে। ইনশাআল্লাহ।
(১। ওফায়াতুল আইয়ান, ২য় খন্ড, — আল্লামা ইবনে খাল্লিকান, ২। আল ইকদুস সামিন ফি তারিখিল বালাদিল আমিন, ১ম খন্ড– মুহাম্মদ বিন আহমদ আল হাসানি ৩। তারীখে বাগদাদ, ১৬শ খন্ড– খতীব বাগদাদী)
২১। রোমান সম্রাটকে হারুনুর রশীদের জবাব
বাগদাদ। ১৮৭ হিজরী।
নিজের দরবারে বসে আছেন খলীফা হারুনুর রশীদ। পুরো দরবারে পিনপতন নীরবতা। খলিফার চেহারা রাগে থমথম করছে। সভাসদদের চেহারায় ভীতির ছাপ। অস্বস্তি নিয়ে দূরে সরে বসে কেউ কেউ।
বাইজেন্টাইনের সম্রাট নিকফুরের পত্র এসেছে খলীফা হারুনুর রশীদের নামে। সম্প্রতি গ্রীকরা রানী আইরিনকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে নিকফুরকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। আইরিনের সাথে খলীফা মাহদির সন্ধিচুক্ত হয়েছিল। এই চুক্তির ফলে রানী আইরিন প্রতিবছর মুসলমান খলিফাকে কর দিতেন। ধারণা করা হয়েছিল নিকফুরও এই চুক্তি বজায় রাখবে। কিন্তু আজ সকালে নিকফুরের পক্ষ থেকে খলিফার কাছে পত্র এসেছে। পত্রের ভাষ্য নিম্মরুপ
‘রোমের সম্রাট নিকফুরের পক্ষ থেকে আরবদের বাদশাহ হারুনের নিকট। আমাদের সাবেক রানী তোমাকে কিশতির আসনে বসিয়ে নিজে বসেছেন বোড়ের আসনে। তার নারীসুলভ দূর্বলতা ও বোকামীর জন্যই এমনটা হয়েছে। এই পত্র পাওয়া মাত্র তুমি এতদিনে গৃহীত সকল অর্থ ফেরত দিবে, নইলে তরবারীই আমাদের মধ্যে মীমাংসা করবে’
#
পত্র পড়ে খলীফার চেহারায় ক্রোধ ঝিলিক মেরে উঠে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিকফুরের পত্রের অপর পৃষ্ঠায় তিনি লিখে দিলেন, আমিরুল মুমিনিন হারুনের পক্ষ থেকে রোমের কুকুর নিকফুরের নিকট। আমি তোমার পত্র পাঠ করেছি। পত্রের জবাব তুমি নিজ চোখে দেখবে, শুনবে না।
খলিফা উজির জাফর বারমাকিকে আদেশ দিলেন সৈন্যদের প্রস্তুত করো। আজই আমরা যুদ্ধযাত্রা শুরু করবো।
সেদিনই শুরু হলো যুদ্ধযাত্রা।
#
খলীফা সসৈন্যে ঝড়ের বেগে পৌছলেন বাইজান্টানদের অন্যতম শক্তিশালী দুর্গ হিরাক্লিয়াতে। এখানে নিকফুরের বাহিনীর সাথে খলীফার বাহিনীর তীব্র লড়াই হয়। জালালুদ্দিন সুয়ুতি এই যুদ্ধকে বলেছেন, বিখ্যাত যুদ্ধ ও প্রকাশ্য বিজয়’। এ যুদ্ধে নিকফুর পরাজিত হয়। সে প্রতিবছর আগের চেয়েও বেশি কর দিতে রাজি হয়ে শান্তিচুক্তি করে।
চুক্তি শেষে খলিফা হারুনুর রশিদ রাক্কা শহরে ফিরে আসেন। সময়টা ছিল শীতকাল। তীব্র শীতে তুষার জমেছে পাহাড়ি রাস্তাগুলোতে। নিকফুর ভাবলো এই সময় খলিফা চাইলেও আর ফিরতে পারবেন না। সে চুক্তি ভংগ করে। চুক্তিভংগের সংবাদ পৌছলো রাক্কা শহরে। সভাসদরা হতভম্ব। এই সংবাদ খলিফার কানে তুলবেন এমন সাহস নেই কারো। পরে আবদুল্লাহ বিন ইউসুফ তাইমি কবিতা আবৃত্তি করে খলিফাকে নিকফুরের চুক্তিভংগের সংবাদ দিলেন।
খলীফা এই সংবাদ শুনে বিন্দুমাত্র অপেক্ষা করলেন না। তিনি আবারো বাইজেন্টাইনের পথ ধরলেন। হাড় কাপানো শীতে তিনি অতিক্রম করলেন টরাস পর্বত। হাজির হলেন নিকফুরের শিবিরের দোড়গোড়ায়। এবারও প্রচন্ড যুদ্ধ হলো। নিকফুর শরীরের কয়েক জায়গায় আঘাতপ্রাপ্ত হলো।.৪০ হাজার সৈন্যসহ নিকফুর ময়দান থেকে পালিয়ে যায়। পরে সে ক্ষমা প্রার্থনা করে ও সন্ধি করার আহবান জানায়।
সূত্র
—————
১। আল কামেল ফিত তারিখ, ৫ম খন্ড, ৩৩৩ পৃষ্ঠা– ইবনুল আসীর। দারুল কুতুবিল ইলমিয়া, বৈরুত।
২। তারিখুল খুলাফা, ৪৬১ পৃষ্ঠা– জালালুদ্দিন সুয়ুতি। দারুল মিনহাজ লিন নাশরি ওয়াত তাউযি, জেদ্দা।
৩। তারিখুল ইসলাম ওয়া ওয়াফায়াতুল মাশাহিরি ওয়াল আলাম, ১২শ খন্ড, ৩৫ পৃষ্ঠা– হাফেজ শামসুদ্দিন যাহাবী। দারুল কুতুবিল আরাবি,বৈরুত।
২২। এক মহিলার অবিশ্বাস্য ঘটনা
দম মেরে বসে আছেন খাওয়ারেজমের শাসক আবুল আব্বাস আহমাদ বিন মোহাম্মদ বিন তালহা বিন তাহের। এইমাত্র যা শুনেছেন তা রীতিমত অবিশ্বাস্য।
‘নাহ, এমনটা হতেই পারে না। আমি বিশ্বাস করি না’ সামনে বসা আবদুল্লাহ বিন আবদুর রহমানকে লক্ষ্য করে বললেন তিনি।
‘অবিশ্বাসের কিছু নেই। আমি যা বলেছি তাই সত্য। বাল্যকাল থেকেই আমি এই মহিলার কথা শুনে আসছি। তিনি কোনো খাবার কিংবা পানীয় গ্রহণ করা ছাড়াই বেঁচে আছেন। তিনি বসবাস করেন আন নামক একটি এলাকায়, যা খাওয়ারেজম থেকে অর্ধদিনের দূরত্বে অবস্থিত। একবার আমাদের এলাকার লোকজন আমাকে পাঠালো তার সাথে দেখা করে এই সংবাদের সত্যতা নিশ্চিত হতে। আমি তার সাথে দেখা করি। তিনি আমাকে নিজের জীবনের কাহিনী শোনান’ বললেন আবদুল্লাহ বিন আব্দুর রহমান।
‘আমাকেও তার কাহিনী শোনান’ আবুল আব্বাস আহমদ আগ্রহী হয়ে উঠেন।
‘তাহলে শুনুন। আমার এখনো সেদিনের কথা স্পষ্ট মনে আছে। দিনটি ছিল রৌদ্রজ্জ্বল। দুপুরের দিকে আমি সেই মহিলার ঘরে পৌছি। তাকে অনুরোধ করি তার জীবনকাহিনী শোনাতে। তিনি বলেন,
আমার নাম রহমত বিনতে ইবরাহীম। আমার স্বামী ছিলেন একজন দিনমজুর। আমাদের কয়েকটি সন্তান ছিল। আমাদের দিনগুলি ছিল হাসিমুখর। সারাদিন ঘরের কাজ সেরে আমি অপেক্ষায় থাকতাম স্বামী কখন ফিরবেন। কয়েক বছর আগের কথা। পার্শ্ববর্তী রাজ্যের শাসক আকতাই খান তিন হাজার সৈন্য পাঠালো খাওয়ারেজম আক্রমন করার জন্য। আকতাই খান ছিল তীব্র মুসলিম বিদ্বেষী। প্রায়ই সে মুসলিম বসতিতে লুটপাট চালাতো। তার সৈন্যরা আমু দরিয়া অতিক্রম করে সীমান্তে পৌছে যায়। তারা জুরজানিয়া কেল্লা অবরোধ করে।কেল্লার অধিপতি সাহায্য চেয়ে আবদুল্লাহ বিন তাহেরের কাছে পত্র লিখেন। আমাদের সৈন্যরা কেল্লার প্রাচীরের উপর থেকে লড়ছিল। দুইদিন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর তৃতীয় দিন আবদুল্লাহ বিন তাহেরের সাহায্য এসে পৌছে। তিনি সেনাপতি মিকাইলের নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। সেদিন মুসলিম বাহিনী কেল্লা থেকে বের হয়ে লড়তে থাকে। আমার স্বামিও সেদিনের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। প্রচন্ড যুদ্ধ হয়। দিনশেষে কেল্লায় মুসলমানদের চারশো লাশ আনা হয়। আমার স্বামীও সেদিনের যুদ্ধে শহীদ হন। তার লাশ আনা হলে আমি কান্নায় ভেংগে পড়ি। অন্য মহিলারা আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল। আমি ভাবছিলাম আমার সন্তানদের কথা। কীভাবে তাদের সান্ত্বনা দিব? কান্না করতে করতে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। স্বপ্নে দেখি আমি এক সবুজ শ্যামল উদ্যানে হাটছি। আমি আমার স্বামীকে খুজছি। অদৃশ্য থেকে একটি কন্ঠ ভেসে আসে, ডানদিকে যাও। আমি ডানদিকের পথ ধরি। এক প্রশস্ত খোলা মাঠ। বাতাসে সবুজ ঘাস নড়ছে। সামনে অনেকগুলো অট্টালিকা, এমন সুন্দর অট্টালিকা যার বিবরণ দেয়ার ভাষা আমার নেই। প্রাসাদের সামনে কিছু নহর প্রবাহিত হচ্ছে। আমি সামনে হাটতে থাকি। সবুজ পোষাক পরিহিত একদল লোকের সাক্ষাত পাই। তারা খাবার খাচ্ছে। আমি তাদের মাঝে আমার স্বামীকে খুজতে থাকি। এরমধ্যে আমার স্বামীর কন্ঠে ভেসে আসে, রহমত আমি এদিকে। ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতেই স্বামীকে দেখতে পাই। তার চেহারা পূর্নিমার চাদের মতো শুভ্র। তিনি সাথীদের সাথে বসে খাবার খাচ্ছেন। আমি দ্রুত স্বামীর কাছে চলে যাই।
আমি তার পাশে পৌছলে তিনি তার সাথীদের বলেন, আমার স্ত্রী ক্ষুধার্ত। তাকে কিছু খাওয়াতে চাই। সাথীরা তাকে অনুমতি দেন। স্বামী আমার মুখে খাবারের একটি টুকরো তুলে দেন। টুকরোটি ছিল বরফের মত উজ্জ্বল শুভ্র, মাখনের মত নরম এবং মধুর মত মিষ্টি। এরপর স্বামী আমাকে বিদায় জানান। তিনি বলেন, যাও আল্লাহ তোমার রিজিকে বরকত দিবেন। যতদিন বেঁচে থাকবে তোমার আর কোনো খাবারের দরকার হবে না।
আমার ঘুম ভেংগে যায়। সেদিনের পর আমি কখনোই ক্ষুধা কিংবা পিপাসা অনুভব করিনি। আমি খাদ্য ও পানীয় ছাড়াই সুস্থ বেঁচে আছি। আলহামদুলিল্লাহ।’
#
‘পুরো ঘটনাটিই অবিশ্বাস্য’ আবদুল্লাহ বিন আবদুর রহমানের কথা শেষ হলে বললেন আবুল আব্বাস আহমদ।
‘বিশ্বাস না হলে এককাজ করতে পারেন। সেই মহিলা তো খুব বেশি দূরে থাকেন না। তাকে এখানে নিয়ে আসুন। বিষয়টির সত্যতা যাচাই করুন’
এই পরামর্শ আবুল আব্বাস আহমদের পছন্দ হয়। তিনি আনের শাসনকর্তাকে পত্র লিখে আদেশ দেন সেই মহিলাকে সম্মানের সাথে আমার প্রাসাদে পাঠিয়ে দাও। মহিলা পৌছলে আবুল আব্বাস আহমদ তার আম্মাকে বলেন, মা আপনি এই মহিলার সেবাযত্নের প্রতি খেয়াল রাখবেন। তবে সতর্কতার সাথে খেয়াল করবেন তিনি কোনো পানীয় কিংবা খাবার গ্রহন করেন কিনা।
এই মহিলা দুই মাস প্রাসাদে অবস্থান করেন। পরে আবুল আব্বাস আহমাদের মা বলেন, আল্লাহর কসম আমি কখনো তাকে খাবার বা পানীয় গ্রহন করতে দেখিনি। এটা আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন। পরে এই মহিলাকে সসম্মানে তার এলাকায় ফিরিয়ে নেয়া হয়। এর কিছুদিন পর তিনি ইন্তেকাল করেন।
#
আবুল আব্বাস ঈসা তহমানিও এই মহিলার সাক্ষাত পেয়েছিলেন। তিনি বলেন, আমি খাওয়ারেজমে এক মহিলার সাক্ষাত পাই যিনি বিশ বছর খাবার ও পানীয় ছাড়া ছেড়ে বেঁচে ছিলেন।
তিনি আরো বলেন, আল্লাহ তাআলা প্রায়ই নিজের কুদরতের বহিঃপ্রকাশ ঘটান। এর দ্বারা তিনি ইসলামের শক্তি ও মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।
আবুল আব্বাস ঈসা তহমানি বলেন, এই মহিলা খাবার গ্রহণ করতেন না। এমনকি তিনি খাবার থেকে একটু দূরে সরে বসতেন। কখনো কখনো নাকে হাত দিতেন। আমি তাকে প্রশ্ন করি, আপনার ঘুম আসে? তিনি জবাব দেন, হ্যা, স্বাভাবিক মানুষের মতই।
‘আপনি তো কিছুই খান না। শরীরে কোনো দূর্বলতা অনুভব হয়?’
‘নাহ কখনোই শরীরে দূর্বলতা অনুভব করিনি’
‘আপনি কি নামাজের জন্য অজু করেন?’
‘হ্যা। যদিও আমার প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারার দরকার হয় না কিন্তু ফকিহরা আমাকে বলেছেন অজু করে নিতে। যেহেতু আমার ঘুম আসে’
‘আমি শুনেছি আপনি প্রায়ই সদকা গ্রহন করেন। এটা দিয়ে কী করেন?’
‘আমার ও বাচ্চাদের জন্য কাপড় ক্রয় করি’
সূত্র ————– ঘটনাটি হাকেম আবু আবদুল্লাহ নিশাপুরীর সূত্রে হাফেজ শামসুদ্দীন যাহাবী তার রচিত ‘তারিখুল ইসলাম ওয়া ওয়াফায়াতুল মাশাহিরি ওয়াল আলাম’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। (২২শ খন্ড, ২১৮-২২ পৃষ্ঠা)। দারুল কিতাবিল আরাবি।
এই ঘটনা সম্পর্কে যাহাবী লিখেছেন, ঘটনাটি সত্য। এটি আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন। (সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১৩শ খন্ড, ৫৭২ পৃষ্ঠা) মুআসসসাতুর রিসালাহ।
একই ধরনের আরেকটি বর্ননা আছে আয়েশা বিনতে আবদুল্লাহ বিন আসেম আন্দালুসিয়া সম্পর্কেও। যাহাবীর সুত্রে ইবনে হাজার আসকালানী লিখেছেন, তিনি বিশ বছর খাবার ও পানীয় ছাড়া বেঁচে ছিলেন। (আদ দুরারুল কামিনা, ২য় খন্ড, ২৩৬ পৃষ্ঠা)
২৩। মুনজির বিন সাইদের সত্য উচ্চারণ
মুনজির বিন সাইদ আল বাল্লুতি। আন্দালুসের বিখ্যাত আলেম। দীর্ঘদিন তিনি কর্ডোভার কাজি ছিলেন। সুবক্তা হিসেবে তার প্রসিদ্ধি ছিল। তিনি ছিলেন ফকিহ। কাব্যচর্চাতেও তার সুনাম ছিল। ইবনে বাশকুয়াল লিখেছেন, মুনজির বিন সাইদ অধিক হারে নফল রোজা রাখতেন । নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়তেন। সত্য প্রকাশে ছিলেন নির্ভিক। কারো কটুক্তি কিংবা অসন্তুষ্টির ভয় করতেন না তিনি।
# খলিফা আবদুর রহমান আন নাসির। আন্দালুসের শ্রেষ্ঠ শাসকদের একজন। তার শাসনামলে আন্দালুসের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোতে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। তিনি কর্ডোভার জামে মসজিদ সম্প্রসারণ করেন। বিখ্যাত আয যাহরা প্রাসাদ তিনিই নির্মান করেন। ঐতিহাসিক মাক্কারী ও ইবনুল আযারী এই প্রাসাদের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
# আয যাহরা প্রাসাদের কয়েকটি স্তম্ভে সোনা ও রুপার প্রলেপ দেয়া হচ্ছে। ঘুরে ঘুরে কাজ পর্যবেক্ষণ করছেন খলীফা আবদুর রহমান আন নাসির। এ সময় উপস্থিত হলেন মুনজির বিন সাইদ আল বাল্লুতি।
‘আমার পূর্বে আর কোনো খলিফাকে এমন কাজ করতে দেখেছেন কিংবা শুনেছেন?’ গর্বের সুরে জিজ্ঞেস করলেন খলীফা।
মুনজির বিন সাইদের চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠে। তিনি বলেন, হে আমিরুল মুমেনিন। শয়তান আপনাকে এ অবস্থানে নিয়ে এসেছে। ‘একথা বলছেন কেন?’ অবাক হলেন খলিফা।
মুনজির বিন সাইদ কোরআনুল কারিমের আয়াত তিলাওয়াত করলেন,
وَلَوْلَا أَن يَكُونَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً لَّجَعَلْنَا لِمَن يَكْفُرُ بِالرَّحْمَٰنِ لِبُيُوتِهِمْ سُقُفًا مِّن فِضَّةٍ وَمَعَارِجَ عَلَيْهَا يَظْهَرُونَ — وَلِبُيُوتِهِمْ أَبْوَابًا وَسُرُرًا عَلَيْهَا يَتَّكِئُونَ — وَزُخْرُفًا ۚ وَإِن كُلُّ ذَٰلِكَ لَمَّا مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۚ وَالْآخِرَةُ عِندَ رَبِّكَ لِلْمُتَّقِينَ
সত্য প্রত্যাখ্যানে মানুষ এক মতালম্বী হইয়া পড়িবে এই আশংকা না থাকিলে দয়াময় আল্লাহকে যাহারা অস্বীকার করে উহাদিগকে আমি দিতাম উহাদের গৃহের জন্য রৌপ্য নির্মিত ছাদ ও সিড়ি যাহাতে উহারা আরোহণ করে। এবং উহাদের ঘরের জন্য দরজা ও পালংক, যাহাতে উহারা হেলান দিয়া বিশ্রাম করিতে পারে। এবং স্বর্ণ নির্মিতও। আর এসবই তো পার্থিব জীবনের ভোগ সম্ভার। মুত্তাকীদের জন্য তোমার প্রতিপালকের নিকট রহিয়াছে আখিরাতের কল্যাণ। (সূরা যুখরুফ, আয়াত ৩৩,৩৪,৩৫)
আয়াত শুনে খলীফা অনেকক্ষণ মাথা নিচু করে বসে থাকেন। এরপর তিনি ধরা গলায় বলেন, আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিক। আপনি সত্য বলেছেন। এরপর তিনি স্তম্ভগুলো সরিয়ে ফেলার আদেশ দেন।
# মুনজির বিন সাইদের জন্ম ২৭৩ হিজরীতে। তিনি ইন্তেকাল করেন ৩৫৫ হিজরীতে। রহিমাহুল্লাহ।
(সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১৬শ খন্ড, ২৭৩ পৃষ্ঠা– হাফেজ শামসুদ্দিন যাহাবী)
২৪। মৃত্যু যেখানে সুন্দর হয়ে ওঠে
৯২৩ হিজরী।
মালোয়ার ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছেন মন্ত্রী মন্দলি রায়। প্রাণভয়ে ভীত সুলতান মাহমুদ শাহ রাতের আধারে পালিয়েছেন নিজের রাজ্য থেকে। ক্ষমতার চাবি পেয়ে মন্দলি রায় হয়ে উঠে অপ্রতিরোধ্য। রাজ্য থেকে ইসলামী নিদর্শনগুলো সরিয়ে ফেলা হয়। পৌত্তলিক প্রথার প্রচার করা হয় ব্যাপকভাবে। নিজের রাজ্য ও জনগণ নিয়ে চিন্তিত মাহমুদ শাহ ভাবলেন, এর বিহিত করা দরকার। কিন্তু কে তাকে সাহায্য করবে? কার কাছে যাবেন? ভাবতে ভাবতে আশার আলো দেখলেন তিনি। একটাই সমাধান চোখে পড়লো তার। গুজরাট যাওয়া যায়। সুলতান মুজাফফর শাহ হালিমের সাথে দেখা করে তাকে সব জানাতে হবে। তিনি নিশ্চয় বসে থাকবেন না। কিছু একটা পদক্ষেপ নিবেনই।
মাহমুদ শাহ গুজরাটে পৌছলেন। দেখা করলেন সুলতান মুজাফফর শাহ হালিমের সাথে। মালোয়ার বৃত্তান্ত শুনে ব্যথিত হলেন সুলতান। দ্রুত সেনাবাহিনী প্রস্তুত করে রওনা হলেন মালোয়ার দিকে। সুলতানের বাহিনী ঝড়ের গতিতে মান্ডো পৌছে। সুলতান এখানের কেল্লা অবরোধ করেন। টানা কয়েকদিন থেমে থেমে যুদ্ধ চলছিল। আচমকা কেল্লার ফটক খুলে যেত। কয়েকজন অশ্বারোহী বের হয়ে সুলতানের বাহিনীতে হামলা চালিয়ে দ্রুত আবার কেল্লায় ফিরে যেত। এসব হামলায় দুপক্ষেই হতাহত হতো। মন্দলি রায় ভেবে দেখলো সুলতানের বাহিনীর সাথে লড়ে সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। সে রানা সংঘের কাছে সাহায্য চেয়ে পত্র লিখে। রানা সংঘ সুলতানের মুকাবিলা করার জন্য বাহিনী নিয়ে রওনা হয়। সুলতান মুজাফফর শাহ এ সংবাদ শুনে আদিল খান ফারুকি, ফাতাহ খান ও কওয়াম খানকে রানা সংঘের মোকাবিলা করার জন্য প্রেরণ করেন। রানা সংঘ সারেঙ্গপুরের কাছাকাছি এসে সুলতানের বাহিনীর কথা জানতে পেরে আর সামনে এগুনোর সাহস করেনি। সে হতাশ হয়ে ফিরে যায়।
কয়েকদিন যুদ্ধের পর সুলতান দুর্গ জয় করেন। সুলতানের বাহিনী কেল্লার ভেতর প্রবেশ করে। সুলতান আমীরদের সাথে নিয়ে কেল্লার বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন। এসময় তারা মালোয়া রাজ্যের সমৃদ্ধি ও ধনভান্ডার সম্পর্কে অবগিত হন। আমিরদের একজন জানতে চাইলো, সুলতান, এখন এ রাজ্য নিয়ে কী করবেন? সুলতান জবাব দিলেন, মাহমুদ শাহকে ফেরত দিব।
আমিরদের কেউ কেউ সাহস করে বলে ফেলে, এ যুদ্ধে আমাদের প্রায় দুহাজার যোদ্ধা নিহত হয়েছে। আপনার উচিত এ রাজ্য নিজের করে নেয়া। মাহমুদ শাহকে ফিরিয়ে দেয়া কোনোভাবেই উচিত নয়। একথা শুনে সুলতান দূর্গ পরিদর্শন বন্ধ করে কেল্লার বাইরে চলে আসেন। তিনি মাহমুদ শাহকে বলেন, আমার সাথীদের কাউকে আর কেল্লার ভেতর প্রবেশ করতে দিবেন না। মাহমুদ শাহ সুলতানকে কয়েকদিন কেল্লায় অবস্থান করার আমন্ত্রন জানান কিন্তু তিনি এ প্রস্তাব গ্রহণ করেননি।
অনেকদিন পর সুলতান তার এক প্রিয়জনকে বলেছিলেন, আমি এই জিহাদ শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই করেছিলাম। কিন্তু আমিরদের বক্তব্য শুনে মনে হলো শীঘ্রই হয়তো আমার নিয়ত বদলে যাবে, ইখলাস নষ্ট হবে। আমি সুলতান মাহমুদের কোনো উপকার করিনি, তিনিই আমার উপকার করেছেন। তার কারনে আমি জিহাদে অংশগ্রহণের সৌভাগ্য অর্জন করেছি।
— এই হলেন গুজরাটের সুলতান মুজাফফর শাহ হালিম। তিনি শুধু নিছক একজন শাসকই ছিলেন না। তিনি ছিলেন ফকিহ ও মুহাদ্দিস। সুলতান মুজাফফর শাহ হালিমের জন্ম ৮৭৫ হিজরীতে, গুজরাটে। তিনি মাজদুদ্দিন মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ এলায়জির কাছে পড়াশোনা করেন। হাদিস পড়েন শায়খ জামালুদ্দিন মুহাম্মদ বিন উমরের কাছে। বাল্যকাল থেকেই তিনি যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। ৯১৭ হিজরীতে তিনি গুজরাটের সিংহাসনে আরোহন করেন। সুলতান অনেক গুনের অধিকারী ছিলেন। তার হাতের লেখা ছিল সুন্দর। সাধারণত তিনি খত্তে নসখ ও খত্তে সুলুসে লিখতেন। তিনি নিজ হাতে কোরআনুল কারিমের অনুলিপি তৈরী করে মদীনায় প্রেরণ করেন। আলেমদের সম্মান করতেন। সবসময় অজু অবস্থায় থাকতেন। জামাতে নামাজ পড়তেন। কখনো মদ স্পর্শ করেননি। যৌবনের শুরুতেই কুরআন হিফজ করেছিলেন।
— মুজাফফর শাহ হালিম ইন্তেকাল করলেন ৯৩২ হিজরীর জমাদিউস সানিতে। দিনটি ছিল শুক্রবার। কয়েকদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। শুক্রবার সকালে গোসল করলেন। দু’রাকাত নামাজ পড়ে মহলে এলেন। স্ত্রীর সাথে সামান্য কথা বলে দরবার ডাকলেন। সবাই উপস্থিত হলে বললেন, আল্লাহর শোকর, আমি কুরআন হিফজের পাশাপাশি প্রতিটি আয়াতের তাফসির, শানে নুযুল ও মর্মকথা আয়ত্ত করি। উস্তাদ জামালুদ্দিন মুহাম্মদ বিন উমরের কাছ থেকে যেসব হাদিসের সনদ নিয়েছি তার সনদ, মতন এবং রাবীদের জীবনি এখনো আমার স্মরণে আছে। আল্লাহর শোকর তিনি আমাকে ফিকহ বিষয়ে জ্ঞানদান করেছেন , যার সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ যার কল্যান কামনা করেন তাকে ফিকহের জ্ঞান দান করেন। (বুখারী)
আমি আল্লামা বাগাভীর তাফসিরগ্রন্থ মাআলিমুত তানযিল একবার পড়েছি। আবার পড়া শুরু করে অর্ধেকে পৌছেছি। আশা করছি জান্নাতে গিয়ে বাকিটা শেষ করবো।
ধীরে ধীরে তার মৃত্যুর লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে। ইতিমধ্যে জুমার আযান হয়। তিনি বলেন, আজ আযান অনেক আগে দিচ্ছে মনে হয়। আসাদুল মুলক এসময় সুলতানের পাশে ছিলেন । তিনি বললেন, আজ শুক্রবার জুমার আযান দিচ্ছে। একথা শুনে সুলতান জোহরের নামাজ পড়ে নেন। সবাইকে মসজিদে যাওয়ার আদেশ দেন। বলেন জোহর পড়েছি, আল্লাহ চাহে তো আসর জান্নাতে গিয়ে আদায় করবো।
এরপর শুয়ে তিনি সুরা ইউসুফের এই আয়াত তিলাওয়াত করতে থাকেন,
رَبِّ قَدْ آتَيْتَنِي مِنَ الْمُلْكِ وَعَلَّمْتَنِي مِن تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ ۚ فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَنتَ وَلِيِّي فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ ۖ تَوَفَّنِي مُسْلِمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ
হে আমার রব, আপনি আমাকে রাজ্য দান করেছেন এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিখিয়েছেন। হে আকাশমন্ডলি ও জমিনের স্রস্টা, আপনিই ইহকালে ও পরকালে আমার অভিভাবক। আপনি আমাকে মুসলিম হিসেবে মৃত্যু দিন এবং আমাকে নেককারদের অন্তর্ভুক্ত করুন। (সুরা ইউসুফ, আয়াত ১০১)
তিনি কয়েকবার এই আয়াত তিলাওয়াত করেন। এরপর কালিমা পড়েন। তার দেহ স্থির হয়ে যায়। শাহী মসজিদে তখন খতিব সাহেব খুতবা দিচ্ছিলেন।
(নুজহাতুল খাওয়াতির, ৪৩২-৪৩৫ পৃষ্ঠা– আল্লামা আবদুল হাই হাসানি নদভী। দার ইবনে হাজম)
—-
হাফেজ আবদুল গনী মাকদিসী রহিমাহুল্লাহ। হাম্বলী মাজহাবের বিখ্যাত আলেম। ৫৪১ হিজরীতে জন্মগ্রহণকারী এই আলেম সম্পর্কে হাফেজ যাহাবী লিখেছেন, তিনি হাম্বলী মাজহাবের ইমাম, হকের পতাকাবাহী, সাহসী, আবেদ, সুন্নাহর অনুসারী। তিনি সত্য প্রকাশে কাউকে ভয় পেতেন না। কোথাও অন্যায় দেখলে কথার মাধ্যমে কিংবা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তা প্রতিহত করতেন। নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া করতেন না। দামেশকে অবস্থানকালে তিনি বাদ্যযন্ত্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কারণে প্রসিদ্ধ ছিলেন।
আবু বকর বিন আহমদ তহান বলেন, একবার সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবীর সন্তানদের কয়েকজন বাগানে বসে তাম্বুরাতে গান শুনছিল। আবদুল গনী মাকদিসী এ দৃশ্য দেখে তাম্বুরা ভেংগে ফেলেন।
আল মালিকুল আদিল বলতেন, আমি এই ব্যক্তির মত আর কাউকে এতটা ভয় পাই না।
তিনি অনেক বই লিখেছেন। তার শিষ্য হাফেজ জিয়াউদ্দিন মাকদিসী বলেন, তিনি এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করতেন না। ফজরের নামাজের পর লোকজনকে কোরআন পড়াতেন। কখনো আবার হাদিসের দরস দিতেন। এরপর অজু করে নামাজে দাড়াতেন। যোহরের আগ পর্যন্ত প্রায় তিনশো রাকাত নফল পড়তেন। এরপর সামান্য ঘুম। যোহরের পর লেখেলাখি কিংবা হাদিসের পাঠদানে ব্যস্ত হতেন। এভাবে মাগরিব পর্যন্ত চলতো। রোজা থাকলে ইফতার করে নিতেন। এশার পর থেকে অর্ধরাত পর্যন্ত ঘুমাতেন। এরপর আবার নামাজে দাড়াতেন। — ৬০০ হিজরী।
মৃত্যু শয্যায় শুয়ে আছেন হাফেজ আবদুল গনী মাকদিসী। টানা ১৬ দিন ধরে তিনি অসুস্থ। দাড়ানোর শক্তি নেই, কথা বলতেও কষ্ট হয়। পিতার মাথার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন আবু মুসা।
‘বাবা, আপনার কিছু লাগবে? আপনি কিছু চান?’ আবু মুসা জিজ্ঞেস করলেন।
‘আমি আল্লাহর রহমত চাই। আমি জান্নাত চাই’ মৃদু কন্ঠে বললেন আবদুল গনী মাকদিসী। ইলমের অন্বেষণে দামেশক, বাগদাদ, ইস্কান্দরিয়া, মোসুল, ইস্ফাহান, হামাদান ও বাইতুল মাকদিস চষে বেড়ানো মানুষটির কন্ঠ আজ বড়ই নিস্তেজ।
মসজিদে ফজরের আজান হয়। আবু মুসা গরম পানি এনে দেন। আবদুল গনি মাকদিসী অজু করেন। পুত্রকে বলেন, নামাজ পড়াও, কিরাত সংক্ষেপ করো। জামাতে নামাজ পড়া হয়। আবদুল গনী মাকদিসী বসে নামাজ পড়েন। নামাজ শেষে আবু মুসা পিতার মাথার পাশে বসেন।
‘সুরা ইয়াসিন পড়ো’ বললেন আবদুল গনী মাকদিসী। আবু মুসা পিতার আদেশমত সুরা ইয়াসিন তিলাওয়াত করেন। এরপর আবদুল গনী মাকদিসী দোয়া করতে থাকেন। পুত্র আবু মুসা তার দোয়াতে আমিন বলেন। আবু মুসা ওষুধ নিয়ে আসেন।
‘বেটা, এখন মৃত্যু ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট নেই’ বললেন আবদুল গনী মাকদিসী।
‘আপনি এখন কী চান?’
‘আমি শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি চাই’
‘আপনি কি আমার উপর সন্তুষ্ট?’
‘হ্যা আমি সন্তুষ্ট’
‘আপনার কোনো অসিয়ত আছে?’
‘কেউ আমার কাছে কিছু পায় না, আমিও কারো কাছে কিছু পাই না’ ‘আমাকে কিছু নসিহত করুন’
‘তোমার উপর আবশ্যক তাকওয়া অবলম্বন করা। সবসময় আল্লাহর আনুগত্য করবে’
এসময় কয়েকজন লোক শায়খকে দেখতে আসে। তারা এসে শায়খকে সালাম দেয়। শায়খ সালামের জবাব দেন। এরপর লোকেরা নিজেদের মধ্যে আলাপ শুরু করে। শায়খ খুব বিরক্ত হন। তিনি বলেন, ‘কী করছো? আল্লাহর জিকির করো। পড়ো লা ইলা ইল্লাল্লাহ। একটু পর লোকজন চলে যায়। শায়খের ঠোট নড়ছিল। দেখে বোঝা যাচ্ছিল তিনি জিকির করছেন। একটু পর তিনি ইন্তেকাল করেন। রহিমাহুল্লাহ।
(সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২১শ খন্ড, ৪৪৩ পৃষ্ঠা– হাফেজ শামসুদ্দিন যাহাবী)
২৫। রজা বিন হায়াতের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত
জাবেক। ৯৯ হিজরী।
মৃত্যুশয্যায় শায়িত উমাইয়া খলিফা সুলাইমান বিন আবদুল মালিক। খলিফার শিয়রে বসে আছেন বিশিষ্ট আলেম রজা বিন হাইওয়াহ।
‘আমাকে পরামর্শ দিন। আমার পর কে খলিফা হবে? কাকে মনোনিত করে যাবো? আমার ছেলেদের কাউকে মনোনিত করবো? ’ খলিফা বললেন।
‘আপনার ছেলে দাউদ রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গিয়েছে। সে জীবিত না মৃত তা জানা যায়নি এখনো। আপনার অন্য সন্তানরা খুবই ছোট। তারা রাজ্যচালনার বয়সে পৌছেনি’ রজা বিন হায়াত বললেন।
‘আমি তাহলে কী করতে পারি?’ খলিফা অসহায় কন্ঠে বললেন।
‘আপনার চাচাতো ভাই উমর ইবনে আবদুল আযিযকে মনোনিত করতে পারেন।’
‘আমার ভাইয়েরা ক্ষিপ্ত হবে। আমি এই ঝুকি নিতে পারি না’
‘আপনি উমর কে মনোনিত করুন। তারপরের খলিফা হিসেবে ইয়াযিদ বিন আবদুল মালিককে মনোনিত করুন। আশা করি এতে তারা শান্ত হবে’
‘তবু এই সংবাদ শুনলে তারা উত্তেজিত হবেই। কী করা যায়?’
‘আপনি একটি কাগজে এখুনি ফরমান লিখে ফেলুন। তারপর একে খামবদ্ধ করে ফেলি। এই খামের লেখার উপর সবার বায়াত নেয়া হবে’
খলিফা দ্রুত কাগজ আনতে বলেন। কাগজ আনা হলে খলিফা তাতে পরবর্তী খলিফা হিসেবে উমর ইবনে আবদুল আযিযের নাম লিখেন। কাগজ খামবদ্ধ করা হয়। ‘এটা নিয়ে যান। সবাইকে বলুন এর উপর বায়াত দিতে’ বললেন খলিফা।
রজা বিন হাইওয়াহ কামরার বাইরে এলেন। উপস্থিতদের বললেন, এই খামের ভেতর যার নাম আছে সেই হবে পরবর্তী খলিফা। তোমরা বায়াত দাও। সবাই নাম জানতে চাইলো।
‘খলিফার মৃত্যুর আগে নাম প্রকাশ করা হবে না’ বললেন রজা বিন হাইওয়াহ। কেউ বায়াত দিলো না। রজা ফিরে এলেন খলিফার কাছে। খলিফা সব শুনে বললেন, পুলিশ প্রধানকে ডেকে আনো। তারপর সবাইকে বায়াত দিতে বলো। কেউ অসম্মতি জানালে তার গর্দানে আঘাত করবে। এবার সবাই বায়াত দেয়। কিছুক্ষণ পর খলিফা ইন্তেকাল করেন।
‘এই খামের ভেতর উমর ইবনে আবদুল আযিযের নাম আছে। তিনিই পরবর্তী খলিফা হতে যাচ্ছেন।’ শান্তকন্ঠে বললেন রজা। আবদুল মালিকের সন্তানরা উত্তেজিত হয়ে উঠে। রজা বলেন, উমরের পর খলিফা হবেন ইয়াযিদ বিন আবদুল মালিক। একথা শুনে তারা শান্ত হয়।
উমর ইবনে আবদুল আযিয পুরো সময়টা চুপচাপ বসে ছিলেন। ‘উঠুন , সবার বায়াত নিতে হবে’ বললেন রজা বিন হায়াত।
একথা শুনে উমর ইবনে আবদুল আযিয উঠে দাড়ান। এবং সবার বায়াত গ্রহন করেন।(১)
— উমর ইবনে আবদুল আযিযের সিংহাসন আরোহনকালে বনু উমাইয়ার শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করা দরকার। শায়খ আবুল হাসান আলী নদভী লিখেছেন, সেসময় হুকুমত কেবল ট্যাক্স ও রাজস্ব আদায়ের একটি ব্যবস্থাপক সংস্থায় পরিণত হয়েছিল। সাধারণ মানুষের আকিদা-আখলাক ও তাদের গোমরাহী কিংবা হেদায়াতের ব্যাপারে তাদের কোনো মাথাব্যাথা ছিল না। প্রাচীন জাহেলী প্রবণতা যা খিলাফাতে রাশেদার প্রভাবে চুপসে গিয়েছিল তা আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। গোত্রীয় অহমিকা, বংশীয় পক্ষপাতিত্ব, স্বজনপ্রীতি এগুলো আবার ফিরে আসে। বাইতুল মাল হয়ে ওঠে খলিফার ব্যক্তিগত সম্পত্তি। গান বাজনা ও আমোদ প্রমোদের প্রতি সবার গভীর অনুরাগ দেখা দেয়। দেখে মনে হচ্ছিল আহত জাহিলিয়াত আবার ফিরে এসেছে প্রতিশোধ নিতে। (২)
এই সময়ে প্রয়োজন ছিল একটা ঝাকুনির। উম্মাহ এমন একজন শাসকের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছিল , যিনি এসে জাহিলী প্রবণতার বিনাশ করবেন। যিনি তার যুহদ, তাকওয়া, সতর্কতা ও সংযমের দ্বারা হুকুমতের প্রাণসত্তা বদলে দিবেন।
উমর ইবনে আবদুল আযিযই হলেন সেই শাসক। — উমর ইবনে আবদুল আযিযের জন্ম ৬১ হিজরীতে। ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিক ও সুলাইমানের শাসনামলে তিনি মদীনার গভর্ণর ছিলেন। যৌবনে তিনি ছিলেন সৌখিন কেতাদুরস্ত যুবকের প্রতিচ্ছবি। তার চলাফেরা ছিল যুবকেদের জন্য ঈর্ষনীয়। তিনি যে পথ অতিক্রম করতেন সেপথে অনেকক্ষণ সুগন্ধি মেখে থাকতো।(৩) খোদাপ্রদত্ত নেক মেজাজ ছাড়া আর কোনো যোগ্যতা তার মাঝে দেখা যায়নি যা দ্বারা বুঝা যাবে তিনি আগামীতে বড় কোনো খেদমত করতে যাচ্ছেন। তাছাড়া সাধারণভাবে তার খলিফা হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল না। হয় সুলাইমানের পুত্ররা খলিফা হবেন, নইলে তার ভাইয়েরা। সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চললে উমর ইবনে আবদুল আযিয বড়জোর কোনো একটি এলাকার শাসনকর্তা হতেন। কিন্তু একজন আলেমের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বনু উমাইয়ার ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিল।
সেই আলেম হলেন রজা বিন হাইওয়াহ। যার পরামর্শে সুলাইমান বিন আবদুল মালিক পরবর্তী খলিফা হিসেবে উমর ইবনে আবদুল আযিযকে মনোনিত করেছেন। উমর ইবনে আবদুল আযিয সিংহাসনে আরোহন করে যেসকল বিপ্লাবত্মক পদক্ষেপ নিয়েছেন, তা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। তার যুহদ ও তাকওয়া নিয়েও ইতিহাসগ্রন্থ সমূহে বিশদ বর্ননা রয়েছে। তবে প্রায়ই আলোচনার আড়ালে থেকে যায় রজা বিন হাইওয়াহর ঘটনাটি।
— রজা বিন হাইওয়াহ ছিলেন তাবেয়ী। তিনি হাদিস বর্ননা করেছেন, আবদুল্লাহ ইবনে উমর, মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান, আবু সাইদ খুদরি, আবু উমামা বাহেলী প্রমুখ থেকে। ইমাম নাসায়ী তাকে সিক্বাহ বলেছেন। ফকিহ হিসেবে তিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন। উমাইয়া খলিফাদের দরবারে তাকে খুব সম্মান করা হত।(৪) ৬৬ হিজরীতে আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান যখন কুব্বাতুস সাখরা নির্মাণ করেন তখন নির্মাণকাজ তদারকির দায়িত্ব দেয়া হয় রজা বিন হাইওয়াহকে। (৫)
সমকালীন আলেমরা রজার প্রশংসায় পঞ্চমুখ । তবে রজা বিন হাইওয়াহর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান হলো, তিনি উম্মাহকে একজন মহান শাসকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।
সূত্র ———– ১। তারিখুল ইসলাম ওয়া ওয়াফায়াতুল মাশাহিরি ওয়াল আলাম, ৬ষ্ঠ খন্ড, ৩৮০ পৃষ্ঠা– হাফেজ শামসুদ্দিন যাহাবী।দারুল কুতুবিল আরাবি। ২। তারিখে দাওয়াত ও আযিমত, ১ম খন্ড, ৩১ পৃষ্ঠা– সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী। মজলিসে তাহকিকাত ও নশরিয়াতে ইসলাম, লখনৌ। ৩। সিরাতু উমারিবনি আবদিল আযিয মা রওয়াহুল ইমাম মালিক বিন আনাস ওয়া আসহাবুহু, ২৫ পৃষ্ঠা— আবু মুহাম্মদ আবদুল্লাহ বিন আবদুল হাকাম। ৪। সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৪র্থ খন্ড, ৫৫৭ পৃষ্ঠা– হাফেজ শামসুদ্দিন যাহাবী। মুআসসাতুর রসালাহ। ৫। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১২শ খন্ড, ৪১ পৃষ্ঠা– হাফেজ ইমাদুদ্দিন ইবনে কাসির। মারকাজুল বুহুস ওয়াদ দিরাসাতিল আরাবিয়া ওয়াল ইসলামিয়া।

Facebook Comments

Write A Comment